ফকিরহাট প্রতিনিধি : ভৈরব নদীর দক্ষিণ তীরে একদিন আস্তানা গেড়েছিলেন এক সাধক, ফকির মঙ্গল শাহ্। লোকমুখে শোনা যায়, তিনি ছিলেন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত তাঁর কাছে। তাঁকে ঘিরেই প্রথম বসে দোকানপাট, সেই জটলা ক্রমে হাট হয়ে ওঠে, আর হাটের নাম হয়ে যায় ফকিরহাট। নামের সঠিক ইতিহাস কোথাও লেখা নেই, তবে এই কাহিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে। আজ সেই হাট পেরিয়ে ফকিরহাট বাগেরহাটের পশ্চিম প্রান্তের একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলা। খুলনা থেকে বাগেরহাটের পথে যাত্রীদের চোখে পড়ে এই জনপদের ব্যস্ত বাজার আর নদীঘেঁষা সবুজ প্রান্তর।
১৯৬৯ সালের ৭ জুন এখানে পুলিশ স্টেশন স্থাপিত হয়। এরপর ১৯৮৩ সালের ১ আগস্ট একে উন্নীত থানার মর্যাদা দেওয়া হয়। ২২ দশমিক ৭৮০৬ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৮৯ দশমিক ৭০৮৩ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত এই উপজেলার আয়তন ১৬০ দশমিক ৬৮ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে খুলনার রূপসা ও মোল্লাহাট, দক্ষিণে রামপাল, পূর্বে বাগেরহাট সদর ও চিতলমারী, পশ্চিমে বটিয়াঘাটা ও রূপসা। একটি উপজেলা পরিষদ, একটি পৌরসভা এবং বেতাগা, লখপুর, পিলজংগ, ফকিরহাট, বাহিরদিয়া মানসা, নলধা মৌভোগ, মূলঘর ও শুভদিয়া, এই আটটি ইউনিয়ন নিয়েই এর প্রশাসনিক কাঠামো। উপজেলা প্রশাসনের সব সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন আছে, তেমনি কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনও।
শিক্ষার আলো এই জনপদে পৌঁছেছে বহুদূর। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী উপজেলায় সাক্ষরতার হার ৮২ দশমিক ২০ শতাংশ। সরকারি ও এমপিওভুক্ত মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রায় ১২৮টি। ফলে গ্রামের পর গ্রামে স্কুল-মাদ্রাসার ঘণ্টা বাজে নিয়মিত, আর সেই শিক্ষার্থীদের অনেকেই পরে পা রাখে শহরের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে।
তবে জীবিকার মূল ভরসা এখনো মাটি। জনসংখ্যার ৩৮ দশমিক ১৫ শতাংশ কৃষক ও কৃষিশ্রমিক। নদীবিধৌত পলিমাটির এই অঞ্চলে ধান, মাছ আর সবজির চাষ বহু পরিবারের সংসার চালায়। ব্যবসায় যুক্ত ১৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ মানুষ, সেবাখাতে ৮ দশমিক ০৩ শতাংশ, মজুরিনির্ভর কাজে ৬ দশমিক ০৭ শতাংশ। পরিবহনে আছেন ৩ দশমিক ০১ শতাংশ, মাছ ধরায় ২ দশমিক ৮১ শতাংশ, আর বাকি ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ অন্যান্য পেশায়। হাটবাজারের কেনাবেচা, নদীপথ আর সড়কের যোগাযোগ মিলিয়ে এখানকার অর্থনীতি চলে নিজস্ব ছন্দে। দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মৎস্য আড়ৎ ফকিরহাটের মূলঘর ইউনিয়নের ফলতিতায় অবস্থিত।
এই মাটি মেধারও জন্ম দিয়েছে। প্রয়াত মন্ত্রী খান এ সবুর, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারজয়ী লেখক শরীফ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান ও সাহিত্যিক ড. নীলিমা ইব্রাহিম, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য গোলাম আলী ফকির, সাবেক সচিব, শিক্ষানুরাগী এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কাজী আজহার আলী এবং জাতীয় ক্রিকেটার আব্দুর রাজ্জাক, সবাই এই জনপদের সন্তান। রাজনীতি, সাহিত্য, শিক্ষা, প্রশাসন ও খেলার মাঠে এই মানুষগুলোর পদচিহ্ন ফকিরহাটের পরিচয়কে করেছে আরও বিস্তৃত। তাঁদের সঙ্গে আছেন চিকিৎসক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা ড. এস এ মালেকও।
ইতিহাসের উপকরণেও সমৃদ্ধ ফকিরহাট। বালিয়াডাঙ্গায় শাহ আউলিয়ার মাজার, দোহাজারীতে প্রাচীন জোড়া শিব মন্দির, খানজাহান আলীর খনন করা কামটার দীঘি, লাল চন্দ্রপুরের দীঘি ও মসজিদ, শাহপুরের রঙ্গুসারে দিঘী, মকরউল্লাহ শাহের দরবার, বুড়ির বটতলা মাজার, মানসা কালিবাড়ী, মূলঘরে নীলকর সাহেবদের কুঠি, সবই ছড়িয়ে আছে এ অঞ্চলের নানা প্রান্তে। এসব স্থাপনা একসঙ্গে বলে দেয়, এই অঞ্চলে মুসলমান সাধক-দরবেশ আর হিন্দু মন্দির-মণ্ডপ পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে বহু শতক ধরে। সাধের বটতলায় বসে মৌসুমি গ্রাম্য মেলা, হয় পূজা উৎসবও। উৎসবের দিনগুলোতে ভিন্ন ধর্ম ও পেশার মানুষ এসে মেশে এক মাঠে, এক মেলায়।
জমিদারি আমলের স্মৃতি বুকে ধরে আছে জয়পুর নলধার খড়রিয়া জমিদার বাড়ি। একদা বড় তরফ ও মেজো তরফের খাজনা আদায়ের কাচারি ছিল যেখানে, সেখানে এখন বসতবাড়ি, পাশে একটি সাব-জেল। টাউন নওয়াপাড়ার জমিদার বাড়িতে আজও টিকে আছে একাধিক সুড়ঙ্গ, অট্টালিকা, পূজামণ্ডপ আর বহু দীঘি। কালের ধুলো জমলেও এসব স্থাপনা এখনো কৌতূহলী দর্শনার্থীকে টানে, ফিরিয়ে নিয়ে যায় জমিদারি আমলের দিনগুলোয়।
আধুনিক পরিচয়ও কম নয়। শুকদাড়ার মহিষ প্রজনন কেন্দ্র দেশের একমাত্র মহিষ খামার, যা এই উপজেলাকে দিয়েছে জাতীয় পরিসরে আলাদা স্বীকৃতি। মূলঘরে আছে খুলনা বিভাগীয় শিশু সদন ও পঙ্গু পুনর্বাসন কেন্দ্র, যেখানে সমাজের অসহায় শিশু ও প্রতিবন্ধী মানুষেরা পান আশ্রয় ও আশার ঠিকানা।
পাশেই বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ ও খানজাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শনের কারণে এ অঞ্চল ইতিহাস-সন্ধানীদের কাছে আগে থেকেই পরিচিত। সেই পথ ধরেই ফকিরহাটের প্রাচীন দীঘি, মাজার ও জমিদার বাড়ি পর্যটনের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। সংরক্ষণ আর পরিকল্পিত উদ্যোগ পেলে এই ছড়ানো-ছিটানো ঐতিহ্যই হয়ে উঠতে পারে উপজেলার বড় সম্পদ।
এক ফকিরের আস্তানা থেকে যাত্রা শুরু করা সেই হাট আজ ইতিহাস, শিক্ষা, কৃষি ও সমাজসেবার এক বিচিত্র মিলনমেলা। নদীর পাড়ের সেই ছোট্ট আস্তানার গল্প আজও বেঁচে আছে মানুষের মুখে মুখে, আর তার ওপর ভর করেই এগিয়ে চলেছে ফকিরহাট।

