ভারত সফরে গিয়ে বড় বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেছেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি কয়েক মাস নয়, বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে৷
ভারতের মিডিয়া নেটওয়ার্ক ১৮- এর সম্পাদক রাহুল জোশীকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে নানা বিষয় নিয়ে খোলামোলা কথা বলার সময় রুবিও এই বার্তা দেন৷
মঙ্গলবার তিনি বলেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার খুব কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে কেবল কয়েকটি অমীমাংসিত বিষয় সমাধানের অপেক্ষায় আছে।
রুবিও আশা প্রকাশ করেছেন যে, খুব শিগগিরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে। আর তা হতে পারে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই।
রাশিয়া নিয়ে উত্তেজনা নিরসনে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির উপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার বিষয়েও সরাসরি কথা বলেছেন রুবিও৷
তিনি বলেন, “ভারতের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান কিছু উত্তেজনা কমাতে সহায়তা করতে পারে।”
পাঁচ মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের জন্য ভারত সফ করছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মঙ্গলবার দুপুরে মুম্বাইয়ে পৌঁছে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীসের সঙ্গে সস্ত্রীক ‘গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া’ পরিদর্শন করেন তিনি।
বিকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে ঐতিহাসিক তাজমহল প্যালেস হোটেলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন রুবিও।
বৈঠকে বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে মার্কো রুবিও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রদপ্তর বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা করে না। তবে ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে আমরা খুবই সক্রিয় ভাবে জড়িত।
“আমার সমপদস্থ কর্মকর্তা, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং আমি এ বিষয়টিকে খুবই গুরুত্ব দিই। আমরা চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছি।
“আমার মনে হয়, চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য অল্প কয়েকটি বিষয় বাকি আছে। খুব দ্রুত তা সমাধা হয়ে যাবে। আমরা আশা করছি, শিগগিরই ঘোষণা করার মতো কিছু সুখবর থাকবে এবং এর পর চুক্তি সই করা হবে।”
কয়েকদিন আগেই ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গয়াল প্রস্তাবিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির প্রথম পর্যায়ের আইনি খসড়া তৈরির কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কো রুবিওর এই মন্তব্য সামনে এল৷
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে আলোচনার পর, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু করে।
এই কাঠামোতে নির্দিষ্ট কিছু ভারতীয় পণ্যের উপর আমেরিকার ১৮ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপের বিধান রাখা হয়েছে এবংমার্কিন শিল্পপণ্য ও বাছাইকৃত কৃষিপণ্যের ওপর ভারতের শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এবছর ফেব্রুয়ারি মাসে, উভয় দেশ একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির কাঠামো ঘোষণা করে। এই কাঠামোর বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে শুল্ক হ্রাস, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং ট্যারিফ ছাড়া অন্যান্য বাধা দূর করার পদক্ষেপ।
ইউক্রেইন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল আমদানির জেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
তবে বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর দেশের কৌশলগত স্বার্থ ও উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট করে দেন। ওদিকে, রুবিও বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভারতের বহুমুখী জ্বালানি আমদানি নীতির ভূয়সী প্রশংসাও করেন।
তিনি বলেন, “ভারত যে তাদের জ্বালানি-উৎসের বৈচিত্র বৃদ্ধির চেষ্টা করছে, তা অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ। রাতারাতি এই পরিবর্তন সম্ভব না হলেও এ বিষয়ে ভারতের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখে আমরা আনন্দিত।”
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য এর আগেই রাশিয়ার বিকল্প তেল সরবরাহকারী হিসেবে ভেনেজুয়েলার নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল।
বৈঠকে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দুই দেশের যৌথ সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা অংশীদারি এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে পারস্পরিক বোঝাপড়াকে আরও মজবুত করার বার্তা দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ওয়াশিংটনের কাছে নয়াদিল্লির কৌশলগত গুরুত্ব যে দিন দিন আরও বাড়ছে, রুবিওর এই ভারত সফর তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
