দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ও জনবহুল জনপদ খুলনা আজ রক্তে ভিজছে। নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রাথমিক অঙ্গীকার হওয়ার কথা ছিল, সেখানে খুলনা পরিণত হয়েছে এক আতঙ্কজনক অপরাধের জনপদে।
রক্তঝরা ভয়াবহতায় আতঙ্কিত জনপদ
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ও জনবহুল জনপদ খুলনা আজ রক্তে ভিজছে। নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রাথমিক অঙ্গীকার হওয়ার কথা ছিল, সেখানে খুলনা পরিণত হয়েছে এক আতঙ্কজনক অপরাধের জনপদে। অপরাধবিজ্ঞান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংবাদমাধ্যমের দীর্ঘদিনের হিসাব বলছে—উন্নয়ন বা আধুনিকায়নের মোড়কে এই নগরী দিন দিন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে রূপ নিচ্ছে। সম্প্রতি খুলনায় ঘটে যাওয়া লোমহর্ষক কিছু হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান ও তার পেছনের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সাধারণ মানুষের জীবন কতটা নিরাপত্তাহীন ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় খুলনার ভয়াবহ অপরাধচিত্র
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত ৯ মাসে খুলনা জেলা ও মহানগরীতে অপরাধের সূচক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পুলিশ ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই মাত্র নয় মাসে সমগ্র খুলনা জেলা ও মহানগরীতে মোট ৭৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
পরিসংখ্যানটির গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় অপরাধের ভৌগোলিক বিস্তার: খুলনা মহানগরীর আটটি থানা এলাকায় সংঘটিত হয়েছে মোট ৪২টি হত্যাকাণ্ড। এর মধ্যে রয়েছে পূর্ব বানিয়াখামার, লবণচরা, সোনাডাঙ্গা, খালিশপুরসহ সংবেদনশীল এলাকাগুলো। খুলনা জেলার নয়টি উপজেলায় সংঘটিত হয়েছে মোট ৩৬টি হত্যাকাণ্ড। মাত্র নয় মাসে আটটি থানা ও উপজেলা মিলিয়ে ৭৮টি প্রাণহানির ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ সামাজিক অপরাধের লক্ষণ নয়। এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং অপরাধচক্রের বেপরোয়া বিস্তারকেই নির্দেশ করে। সর্বশেষ একদিনে নগরীতে জোড়া খুনের ঘটনা এই আতঙ্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
একদিনে দুই খুন
গত ২২ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) খুলনার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ছিল একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ও রক্তাক্ত দিন। একদিনের ব্যবধানে ভোরের আলো ফোটার আগেই এবং সন্ধ্যার ঠিক প্রাক্কালে নগরীর দুটি ভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত হয় দুটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যা পৌণে সাতটার দিকে নগরীর লবণচরা থানার জিন্নাপাড়া বউবাজারের সাত নম্বর গলিতে ঘটে এক পৈশাচিক ঘটনা। নিহত তরুণী গৃহবধূ খুশি বেগম (২৪) ওই এলাকার খোকন শেখের মেয়ে এবং সুমন সরদারের স্ত্রী।
প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় বাজার শেষে রিকশায় চড়ে মা-মেয়ে গলির মাথায় নামেন। খুশি তার মায়ের আগে রিকশা থেকে নামেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তি খুশির কাছে তার স্বামীর অবস্থান জানতে চায়। খুশি তাদের সদুত্তরমূলক কথা না বলতে পারলেই একজন অস্ত্র বের করে এবং অপরজন তাকে কুপিয়ে ও মাথায় গুলি করে হত্যা নিশ্চিত করে।
নিহতের পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এ ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে মাদকসংক্রান্ত বিরোধ। নিহতের স্বামী সুমন সরদার স্থানীয়ভাবে ‘ব্লেড বাবু’ নামে পরিচিত এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারে জড়িত থাকার জোরালো অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডটি কোনো সাধারণ বিরোধের ফল নয়, বরং মাদক সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা আধিপত্য বিস্তারের করুণ পরিণতি।
একই দিনে, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে নগরীর খুলনা সদর থানার পূর্ব বানিয়াখামার বাজার সংলগ্ন আনসার উদ্দিন লেনে খুন হন ৩২ বছর বয়সী যুবক তুষার। তিনি লবণচরা থানার জিন্নাপাড়া এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোরে কয়েকজন যুবকের মধ্যে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তুষারকে লক্ষ্য করে তিনটি গুলি ছোড়া হয়। তার পিঠে একটি গুলি বিদ্ধ হলে তিনি রেজিস্ট্রেশনবিহীন একটি কালো রঙের আর-১৫ মোটরসাইকেলসহ সড়কেই লুটিয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পুলিশ পরবর্তীতে ঘটনাস্থল থেকে একটি মোটরসাইকেল ও গুলির দুটি খোসা উদ্ধার করে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের দাবি, নিহত তুষার কারাগারে আটক খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘পলাশ গ্রƒপে’র সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন ও হত্যা মামলাসহ অন্তত দুটি গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে। পুলিশের ধারণা, প্রতিপক্ষ গ্রুপের সাথে দ্বন্দ্ব বা পূর্ব শত্রুতার জের ধরেই তাকে এই দিনে অত্যন্ত সুকৌশলে ও পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
অপরাধের নেপথ্য কিশোর গ্যাং, মাদক ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়
খুলনার এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল চালিকাশক্তিগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ সামনে আসে:
মাদক বাণিজ্যের রমরমা বিস্তার: খুলনার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের স্পটগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। লবণচরা বা জিন্নাপাড়ার মতো এলাকাগুলোতে মাদক বিক্রির নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুশি বেগম বা তুষার হত্যাকাণ্ডের মূল মূলে এই মাদক সংস্কৃতির উপস্থিতি স্পষ্ট।
সন্ত্রাসী গ্রুপ ও অস্ত্র সংস্কৃতি: খুলনায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পলাশ গ্রুপ ও আশিক গ্রুপসহ নয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। অবৈধ অস্ত্রের অবাধ বিস্তার এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছে। সামান্য বাকবিতণ্ডা বা পূর্বশত্রুতার জেরে প্রাণ কেড়ে নেওয়া এখন অপরাধীদের কাছে অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্রয়: অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। ফলে আইনের দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার সুযোগে তারা বারবার পার পেয়ে যায়, যা সমাজে অপরাধের সংস্কৃতিকে আরও উসকে দেয়।
বৃহত্তর অঞ্চলে মাত্র নয় মাসে ৭৮টি খুন কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। পুলিশ প্রশাসন মাঝেমধ্যে সাঁড়াশি অভিযান বা আসামিদের গ্রেফতারের দাবি করলেও, অপরাধের মূল শিকড় কাটতে তারা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
হত্যাকাণ্ড ঘটার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ যাওয়া, লাশ উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা এবং পরবর্তী সময়ে মামলা দায়ের বা বিচ্ছিন্ন কিছু গ্রেফতার—এই সনাতনী চক্র থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি না করলে এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয়।
