শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে পূজার উপকরণসহ নিজেদের সাজসজ্জার জিনিসপত্র কিনতে কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বাজার ঘুরছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা; তবে দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে শখের সঙ্গে সাধ্যের সমন্বয় করছেন সীমিত আয়ের অনেকেই।
বিক্রেতারাও বলছেন, কিছুটা বাড়তি দামের কারণে ‘হিসাব কষে’ কেনাকাটা সারছেন ক্রেতারা। ফলে বেচাকেনা নিজেদের প্রত্যাশার সঙ্গে ‘সন্তোষজনক’ হয়ে ওঠেনি।
পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে শাঁখা, সিঁদুর, নতুন পোশাক এবং পূজার নানা উপকরণ কিনতে গত কিছুদিন ধরেই ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে। শনিবার সপ্তমীতেও সেরেছেন শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা।
শাঁখারীবাজারে প্রতিটি দোকান সাজানো হয়েছে পূজার যাবতীয় সরঞ্জাম, শাঁখা, সিঁদুর ও দেবীর অলঙ্কারে। এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরে ঘুরে নিজের পছন্দের জিনিসপত্র দরদাম করে কিনছেন ক্রেতারা। অনেকে সপ্তমীর পূজা শেষ করেও এসেছেন বাকি কেনাকাটা সারতে।
এদিন মণ্ডপে অঞ্জলি শেষ করে শাঁখারীবাজারে আসেন গৃহবধূ শিউলী দেবনাথ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সকালে মণ্ডপে পূজা আর অঞ্জলি শেষ করেই বাজারে ছুটে এসেছি। পূজার বাকি দিনগুলোতে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া-আসা থাকবে, তাই শেষ মুহূর্তের কিছু প্রসাধনী আর উপকরণ বাকি ছিল, সেটার কেনাকাটা এখন সেরে নিচ্ছি। অঞ্জলি দিয়ে আসার পর কেনাকাটার আনন্দটাও অন্যরকম লাগে।”
শুধু পুরান ঢাকাই নয়, দুর্গোৎসবের কেনাকাটার আমেজ রয়েছে রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকাতেও। তবে পূজার সপ্তমীতে এসে আগের মত উপচে পড়া ভিড় নেই সেখানে। পূজার ছুটিতে অনেকেই ফিরেছেন গ্রামে।
শনিবার বিকালের গাড়িতে গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় ফেরার আগে ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটে আসেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নিলয় পাল। মা ও দাদির জন্য বিভিন্ন দোকান ঘুরে দুটি শাড়ি কেনেন তিনি।
কেনাকাটা শেষে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নিলয় বলেন, “পাঁচ দিনের ছুটি পেয়েছি, বাড়ি যাচ্ছি। বিকালে গাড়ি। আমাদের এবারের বেতনটা একটু দেরিতেই হলো। তাই আগে কেনাকাটা করতে পারিনি।
“পূজার সময়ে খালি হাতে বাড়ি যাওয়া যায় না। তাই মা ও দাদির জন্য শাড়ি কিনতে এলাম।”
কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই দুর্গাপূজার উপকরণ আর পোশাক-অলঙ্কারসহ সাজসজ্জার জিনিসপত্র বিক্রি বেশি হলেও শেষ মুহূর্তে ক্রেতার আশায় রয়েছেন বিক্রেতাদের অনেকেই। যদিও এবারের বিক্রি নিয়ে ‘হতাশার’ কথাও বলছেন তারা।
শাঁখারীবাজারে পোশাক ও প্রসাধনীর দোকান ‘আশীর্বাদ’ এর মালিক দীপঙ্কর সুর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উৎসবের আমেজ স্পষ্ট হলেও মানুষের মনে কিছুটা টানাপড়েন ও উদ্বেগ রয়ে গেছে। প্রতি বছর পূজায় বিক্রির যে একটা বড় লক্ষ্যমাত্রা থাকে, এবার সেটি পূরণ হয়নি।
“মহালয়ার পর বেচাকেনা কিছুটা বাড়লেও তা খুব একটা সন্তোষজনক নয়।”
শাঁখারীবাজারের আরেক বিক্রেতা সুধীর পাল বিক্রি নিয়ে ‘হতাশা প্রকাশ করে’ বলেন, “প্রতিমা সাজানো থেকে শুরু করে ঘরের পূজার জিনিস, সবকিছুতেই কাঁচামালের দাম বাড়তি। আমরা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছি, কিন্তু ক্রেতারা এসে আঁতকে উঠছেন।
“আগে যিনি পাঁচটি জিনিস কিনতেন, এখন তিনি দুইটি কিনে সারছেন।”
তাঁতীবাজারের স্বর্ণালঙ্কারের দোকানের স্বত্বাধিকারী বিশ্বজিৎ দে বলেন, “সোনা ও পিতলের দাম অতিরিক্ত হওয়ায় মানুষ শৌখিন গয়নার বদলে কেবল বাধ্যতামূলক পূজার নিয়ম রক্ষায় ব্যবহৃত জিনিসগুলোই বেশি কিনছেন।”
ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটের দোকান ‘পাইকারি বাজার’ এর মালিক রাজীব বিশ্বাস বলেন, “শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজই সবচেয়ে বেশি চলছে। এর মধ্যে কাতান, সিল্ক, এমব্রয়ডারি ও জামদানি শাড়ির চাহিদা বেশি।
দুর্গাপূজা সামনে রেখে ঢাকার শাঁখারিবাজারের একটি দোকানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে পূজার সাজসজ্জার সরঞ্জাম। ছবি: শামছুল হক রিপন
“গত দুই থেকে তিন সপ্তাহ ক্রেতাদের বেশ ভিড় ছিল। এখন পূজা শুরু হয়ে যাওয়ায় আগের মত ভিড় নেই।”
আগেরবারের তুলনায় বেচাকেনা কেমন- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “খুব বেশিও না, খুব কমও না। মাঝামাঝি ব্যবসা হয়েছে। তবে এটা ঠিক যে, মূল্যস্ফীতির কারণে গত কয়েক বছরের তুলনায় ক্রেতাদের বাজেট এবার কমেছে।”
বাজারে দাম নিয়ে ‘হা-হুতাশ রয়েছে’ ক্রেতাদের মধ্যেও।
নিউ মার্কেটে কেনাকাটা সারতে আসা সুবর্ণা রানী দাশ বলেন, তিনি তিনটি জামদানি শাড়ি কিনেছেন সাড়ে ৩ হাজার টাকা করে। তার হিসাবে গত বছরের চেয়ে প্রতিটি শাড়িতে অন্তত ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি পড়েছে। একইসঙ্গে বাচ্চাদের পোশাক ও জুতার দামও বেশি মনে হয়েছে তার কাছে।
তার কথায়, “আমাদের বাজেট কমেছে, কিন্তু বাজারভর্তি দামি জিনিস। পূজা বলে কথা, না কিনে তো উপায় নেই। বাজারে একটা শাড়ির যে বাজেট নিয়ে এসেছিলাম, তাতে পছন্দসই জিনিস পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচেই নিতে হয়েছে।”
রমা কান্তা নামে আরেক ক্রেতা বলেন, “এবারের কালেকশন ভালো, কিন্তু দামটা একটু বেশি মনে হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে যে শাড়ি ৫ হাজার টাকা দেখে গেলাম, সেটা আজকে ১২ হাজার টাকা চাচ্ছে।
“দাম সবকিছুর চড়া। তবে এবারের শাড়ি কালেকশন আমার তেমন ভালো লাগেনি। সব কেমন গত কয়েকবছরের মতই।”
পূজা ঘিরে এবার ইমিটেশন গয়নার দোকানে চুড়ি, হার ও আংটি বিক্রি বেশি হওয়ার কথা বললেন নিউ মার্কেটের একটি দোকানের কর্মচারী রতন। তার কথায়, “পূজা ঘিরে চুরি ও গয়না বিক্রি ভালো হয়েছে। চলতি বছরের গত কয়েক মাসের তুলনায় এই মাসে আমরা বেশ ভালো ক্রেতা পেয়েছি।
“এখনো কিছু কাজের অর্ডার আছে, যা কাল-পরশুর মধ্যে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।”
দুর্গাপূজার শেষ সময়ে এসেও বিক্রির আশায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কেনাকাটার সুবিধার্থে মার্কেট খোলা রাখার সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে।
সরকার আগামী ২২ অক্টোবর পর্যন্ত মার্কেট ও শপিং মল খোলা রাখার সময় বাড়িয়ে সকাল ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত র্নির্ধারণ করেছে। ২৩ অক্টোবর থেকে আবার আগের মত রাত ৮টায় দোকানপাট বন্ধ করতে হবে।
জ্বালানি সংকটের কারণে চলতি বছর দোকানপাট খোলা রাখার সময়সূচিতে কয়েক দফা পরিবর্তন এসেছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সন্ধ্যা ৭টার পর দোকান ও শপিং মলে বাড়তি সাজসজ্জার আলো জ্বালানোর ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
