Published on
:
2 min read
চন্দন সেন
আর পাঁচজনের বাড়ির বাচ্চাদের মতো আমিও বড় হচ্ছিলাম। লেখাপড়া শিখে মানুষ হতে কে না চায়। আমিও তাই শৈশবে সরিষা রামকৃষ্ণ মিশনে পড়াশোনা করেছি। হস্টেলে থেকেছি। মহালয়ার ভোরে মহিষাসুরমর্দিনী দিয়ে শুরু হয়ে যেত সেখানকার শারদোৎসবের প্রস্তুতি। নবম শ্রেণির পরে কিছু দিন ভবানীপুরে থাকলেও আমরা পাকাপাকি ভাবে চলে আসি সিআইটি রোডের বাড়িতে। জীবনের আসল মুহূর্তগুলো সবটাই ঘিরে আছে এই বাড়ি। অন্যদের মতো ছোটবেলায় আমারও জামা-জুতো আসত। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গেই সময় কাটাতাম। মর্জিমাফিক ঘুরে বেড়াতাম। আর কিছু না হোক, কয়েক দিনের জন্য বেশ স্বাধীনতা উপভোগ করতাম।
আমরা অত্যন্ত নিম্ন–মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ ছিলাম। আমার মা সংসারের হাল ধরে রাখতেন। এখন বুঝি মা না থাকলে আজ এখানে পৌঁছতেই পারতাম না। কোথায় হারিয়ে যেতাম কে জানে। অভিনয় আমার নেশা। আমার ধ্যান-জ্ঞান ছিল সেই অভিনয়ের জগৎ নিয়েই। মা কোনও দিনও বাধা দেননি। বা ওই বয়সে ঘর ছেড়ে রোজগার করার তাগাদাও দেননি। আমি তখন চুটিয়ে নাটক করছি। আমার শিক্ষাগুরু রমাপ্রসাদ বণিক ও উৎপল দত্ত। পরবর্তীকালে পেয়েছি রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, বিভাস চক্রবর্তী প্রমুখের সান্নিধ্য ও পরামর্শ।
পুজো এলে অবশ্য তখন সেদিকেই আগ্রহটা বাড়ত। আমি প্রথম থেকেই মূর্তি নয়, মণ্ডপ ও সাজসজ্জার অনুষঙ্গ বেশি পছন্দ করতাম। বুদ্ধি ও পরিশ্রমের সাফল্যও দেখতে পেতাম সেই সব কাজে। সাবেকি কাজের আমূল বদল এল যখন থিম পুজোর চলন শুরু হয়ে গেল। সেই সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতাও। তারুণ্যের ছোঁয়ায় দল বেঁধে বেরোবার হুজুগটাও তাই কম কিছু ছিল না। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ সর্বত্র-ই আমরা পৌঁছে যেতাম। চারিদিক জুড়ে শুধুই ভিড় আর ভিড়। গা ঘেঁষাঘেষি, ধাক্কাধাক্কি, হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়া সবই ছিল। আর ছিল নয়ন ভরে সুন্দরী দর্শন। এই দর্শন প্রেমিকা থাকাতে এক রকম, আর প্রেমিকা না থাকাতে অন্য রকম। এমন কথায় অনেক পুরুষই খুশি হবেন নিঃসন্দেহে।
তবে এখন তো বয়স বাড়ছে। ভিড় দেখলেই খুব অস্বস্তি হয়। তার উপরে এই কর্পোরেট কালচারের পুজো আমার একদমই অপছন্দ। ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ আর যেন সহ্য করতে পারছি না। বেশ কয়েক বছর হলো আর সে ভাবে পথে বেরোই না। যেটা করে থাকি তা হলো, অষ্টমী থেকে লক্ষ্মীপুজো অবধি কলকাতার বাইরে চলে যাই। নিঃস্তব্ধ, নিরিবিলি কিছুটা মনকে থিতু করে। এবার পুজোয় বাইরে গেলাম না। কারণ এ বছরেই বহুদিন বিদেশে কাটাতে হয়েছে। তবে চিন্তা নেই। এবারের পুজোর ক’দিন ধরে বন্ধুদের বাড়ি যাওয়া আসা চলবে। নাটক ও অভিনয় নিয়েই জমে যাবে আড্ডা। সঙ্গে খাওয়াদাওয়া। সবচেয়ে বড় কথা, এই আড্ডায় ফিরে পাওয়া যায় পুরোনো বন্ধুদেরও।
তবে হ্যাঁ, ফের ফিরে আসি ‘মা’-এর কথায়। তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন, তাঁকে ঠাকুর দেখাতে ভুলিনি। সেই স্মৃতি সততই সুখের। এটাও জীবনের আরও এক প্রাপ্তি।’
অনুলিখন— বিপ্লবকুমার ঘোষ
