ফ্রান্সের শত শত সুপারমার্কেটে সাইবার হামলার ঘটনায় খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণকারী ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এতে বিপুল পরিমাণ তাজা ও হিমায়িত খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা ফেলে দিতে হয়েছে। নষ্ট হয়ে যাওয়া এসব খাদ্যসামগ্রীর আর্থিক ক্ষতি কয়েক মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেনমার্কের প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান ড্যানফসের সরবরাহ করা শীতলীকরণ নিয়ন্ত্রণ সফটওয়্যারকে লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়। হ্যাকাররা সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কিছু ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা রাতারাতি ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয় বলে জানিয়েছে আক্রান্ত সুপারমার্কেট কর্তৃপক্ষ।
ফ্রান্সের সুপারমার্কেট চেইন কো-অপারেটিভ ইউর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, তাদের একাধিক দোকানে ‘অত্যন্ত গুরুতর ও নজিরবিহীন’ এ হামলা হয়েছে।
কো-অপারেটিভ ইউর শতাধিক সুপারমার্কেট হামলার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ইন্টারমার্শে ও এর সহযোগী ব্র্যান্ড নেট্টোর ১৮০টি দোকান আক্রান্ত হয়েছে। একই ধরনের হামলা ঠেকাতে আরও ১০০টি দোকানকে জরুরি ভিত্তিতে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইন্টারমার্শের এক মুখপাত্র।
দেশটির অন্যান্য বড় খাদ্যপণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্যারেফুর, মোনোপ্রি ও এ. লেক্লের্কও এ হামলার শিকার হয়েছে।
ফ্রান্সে প্রায় ১৫ হাজার সুপারমার্কেট রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ৪০০টি দোকান আক্রান্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে হামলার প্রকৃত ব্যাপ্তি এখনো স্পষ্ট নয়।
পুরোনো সফটওয়্যারের দুর্বলতা কাজে লাগিয়েছে হ্যাকাররা
ড্যানফসের সফটওয়্যারের মাধ্যমে দূর থেকে সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সাধারণত রাতে এসব যন্ত্রে বরফ গলানোর জন্য অল্প সময়ের একটি প্রক্রিয়া চলে। এ সময় তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও পরে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
কিন্তু হ্যাকাররা এ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফ্রিজ ও ফ্রিজারগুলোকে উত্তপ্ত হওয়ার নির্দেশ দেয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেই তাপমাত্রা বজায় রাখে। তবে যন্ত্রগুলোর তাপমাত্রা ঠিক কতটা বাড়তে পারে, সে বিষয়ে প্রকাশিত সব তথ্য নিশ্চিত করেনি ড্যানফস।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আক্রান্ত শীতলীকরণ যন্ত্রগুলো পুরোনো মডেলের। সেগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা হালনাগাদ করা সম্ভব ছিল না, যদিও প্রতিষ্ঠানটি আগে থেকেই এ ধরনের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল।
এক বিবৃতিতে ড্যানফস বলেছে, যেসব ব্যবস্থা এখনো নিরাপত্তা সহায়তার আওতায় রয়েছে, সেগুলোর সফটওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ রাখার পরামর্শ তারা দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে আসছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, গ্রাহকদের ব্যবসায় নির্ভরযোগ্য শীতলীকরণ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে গ্রাহকদের সহায়তা দিতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ফেলে দিতে হয়েছে বিপুল পরিমাণ খাবার
সোমবার সকালে বিভিন্ন সুপারমার্কেটের কর্মীরা কাজে এসে ফ্রিজ ও ফ্রিজার থেকে গরম বাতাস বের হতে দেখেন। কয়েকটি স্থানে ছোটখাটো আগুন লাগার খবরও পাওয়া গেছে।
ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম বিএফএমটিভি প্রকাশিত একটি ছবিতে আইসক্রিমের সারিতে থাকা একটি ফ্রিজারের তাপমাত্রা ২৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস দেখাতে দেখা যায়।
ক্যারেফুর জানিয়েছে, তাদের প্রায় ছয় হাজার দোকানের মধ্যে ৮০টির ফ্রিজে হ্যাকাররা নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। অন্যদিকে, ৪০০টির বেশি দোকান থাকা মোনোপ্রির প্রায় ৫ শতাংশ দোকান আক্রান্ত হয়েছে। যেসব খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো বিক্রি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইন্টারমার্শে ও নেট্টোর মালিক প্রতিষ্ঠান মুসকেতের গ্রুপ বিবিসিকে জানিয়েছে, সোমবার বিকেলেও কয়েকটি দোকানের তাজা ও হিমায়িত খাবার প্রদর্শনের ফ্রিজ বন্ধ ছিল। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এসব ফ্রিজের খাবার সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব তাকগুলোতে নতুন পণ্য তোলার কাজ চলছিল।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ভোর পর্যন্ত ছয় ঘণ্টা ধরে ইন্টারমার্শের কয়েকটি ফ্রিজের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে প্রতিষ্ঠানটি আক্রান্ত সব খাবার ফেলে দিয়েছে।
ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম বিএফএমটিভির তথ্য অনুযায়ী, আলসাস অঞ্চলের দুটি সুপারমার্কেটেই মোট ২ লাখ ৭০ হাজার ইউরোর ক্ষতি হয়েছে। ফলে দেশজুড়ে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তদন্ত শুরু, খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে ফ্রান্সের সরকারি কৌঁসুলিরা। প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর একে দেশজুড়ে একাধিক বড় খাদ্যপণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ফ্রিজে সংঘটিত ‘বড় পরিসরের সাইবার হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের খাদ্যবিষয়ক কমিশনার ক্রিস্টোফ হ্যানসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়ে সব পর্যায়েই আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়টি এখন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
কো-অপারেটিভ ইউর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দোমিনিক শেলশে এক্সে দেওয়া পোস্টে জানান, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে কর্মীরা শীতলীকরণ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন।
তিনি এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ফ্রান্সের খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার জন্য অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতিকে লক্ষ্যবস্তু করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সাইবার হামলার ফলে শুধু খুচরা বিক্রেতাদের আর্থিক ক্ষতিই নয়, খাদ্য অপচয় ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও সামনে এসেছে। বিশেষ করে শীতলীকরণব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল খাদ্য সরবরাহ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
