Published on
:
2 min read
প্যারা এশিয়ান গেমসের পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে একহাতে জাতীয় পতাকা, অন্যহাতে সোনার মেডেল। ক্যামেরা ঝলসে ওঠার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরেই ছবিটা সোজা চলে গেল একটি বিশেষ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে—CRPF-এর অ্যান্টি-মাওবাদী কম্যান্ডো ইউনিট ‘২০৯ কোবরা’ (209 CoBRA)-র গ্রুপে। ছবির নিচে ক্যাপশন নয়, ছিল সহযোদ্ধাদের প্রতি এক স্যালুট। যিনি এই ছবি পাঠালেন, তিনি তোমান কুমার তারাম। চার বছর আগে যাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় এয়ারলিফটে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল, সেই জওয়ানই আজ এশিয়ান প্যারা গেমস ২০২৬-এর তিরন্দাজিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়লেন।
শীতল দেবীর সঙ্গে জুটি বেঁধে ইতিহাস
বৃহস্পতিবার জাপানের আইচি-নাগোয়ায় ভারতের প্যারা আর্চারির শীতল দেবীকে সঙ্গে নিয়ে কম্পাউন্ড মিক্সড টিম ইভেন্টে সোনা জেতেন ছত্তিশগড়ের অহিবরণ নওয়াগাঁওয়ের বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সি তোমান। কোয়ালিফিকেশন রাউন্ডে ১,৪০২ পয়েন্ট সংগ্রহ করে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েন এই দুই ক্রীড়াবিদ। এরপর ফাইনালে ইন্দোনেশিয়ার জুটিকে ১৫১-১৪৮ স্কোরে হারিয়ে দেশকে এনে দেন তিরন্দাজির প্রথম সোনা। জন্মগত ত্রুটির কারণে দুই হাত না থাকা শীতল দেবীর পায়ের আঙুলে ধনুক ছোঁড়ার লড়াইয়ের সঙ্গে কৃত্রিম বাঁ পায়ে দাঁড়িয়ে তোমানের এই নিখুঁত নিশানা গোটা ক্রীড়াবিশ্বকে চমকে দিয়েছে।
পদক জয়ের পর ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তোমান বলেন, ‘২০৯ কোবরা ব্যাটেলিয়নের কম্যান্ডো হিসেবে ডিউটি করার সময় বাঁ পা হারানোর পর চার বছরেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। সে সময় মনে হয়েছিল জীবনটা শেষ, অবসাদে ডুবে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরিবার, সহকর্মী এবং সিআরপিএফের আধিকারিকদের ভরসাতেই আমি আবার নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই।’
মাওবাদীদের সঙ্গে লড়তে গিয়ে হারান পা
স্মৃতি হাতড়ে তিনি জানান, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর এনগেজমেন্ট সবে সম্পন্ন হয়েছিল। তখনই ডাক আসে ঝাড়খণ্ডের লোহারদাগার জঙ্গলে এক অ্যান্টি-মাওবাদী অপারেশনের। টানা চার দিন ধরে পাহাড়ি ট্র্যাকে মাওবাদীদের তাড়া করার সময় হঠাৎ এক IED-র ওপর পা পড়ে যায় তোমানের। বিস্ফোরণে উড়ে যায় তাঁর বাঁ পায়ের পাতা। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে কপ্টারে রাঁচি নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলে অস্ত্রোপচার। ওই দুর্ঘটনার কিছুদিন পরই অন্য এক অভিযানে প্রাণ হারান তাঁর বন্ধু কনস্টেবল রাজেশ কুমার। তোমান বলেন, ‘আমার এই এশিয়ান গেমসের সোনা আমি বন্ধু রাজেশ এবং সিআরপিএফের জওয়ানদের উৎসর্গ করছি।’
তোমানের জীবনের মোড় ঘোরে যখন তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় হায়দরাবাদের ন্যাশনাল সেন্টার অফ দিব্যাঙ্গ এমপাওয়ারমেন্টে (NCDE)। সেখানে কৃত্রিম পা লাগানোর পর সিআরপিএফের আর্চারি কোচ পঙ্কজ সিংয়ের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। কোচ পঙ্কজ জানান, শুরুতে তোমান কোনও উৎসাহ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু স্থানীয় এক প্রতিযোগিতায় শিশুদের তির ছোড়া দেখে জেদ চাপে কমান্ডোর। কৃত্রিম পায়ে দাঁড়িয়ে শরীরের সম্পূর্ণ ভর ধরে রেখে ধনুক টানা শুরু করেন। এর পর সুস্থ ও সক্ষম প্রতিযোগীদের সঙ্গে খেলে তিনি নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পান।
২০২৫ সালে প্যারা ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে ব্যক্তিগত সোনা ও শীতল দেবীর সঙ্গে মিক্সড ব্রোঞ্জ জিতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা দিয়েছিলেন তিনি। আর এবার নাগোয়ার ঝোড়ো হাওয়া সামলে বিশ্ব রেকর্ডসহ জিতলেন সোনা।
তোমানের স্ত্রী রেণুকা বলেন, ‘যখন উনি পা হারান, তখন আমার বাবা এবং আমি এক মাসের বেশি সময় রাঁচির হাসপাতালে ওঁর পাশে কাটিয়েছি। এনগেজমেন্ট ভেঙে দেওয়ার কোনও প্রশ্নই ছিল না আমাদের কাছে। আজ ওঁর গলায় সোনা দেখে গোটা দেশের সঙ্গে আমরাও গর্বিত।’
