প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় চাম্পির প্রভাবে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে তাইওয়ান। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ঝড়ের প্রভাবে দ্বীপজুড়ে প্রবল বাতাস ও মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বন্ধ রাখা হয়েছে আর্থিক বাজারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বাতিল করা হয়েছে প্রায় এক হাজার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। ঝড়ের আঘাতে একজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন ১৬৩ জন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর প্রশান্ত মহাসাগরে আঘাত হানা শক্তিশালী ঝড়গুলোর একটি ঘূর্ণিঝড় চাম্পি। একপর্যায়ে এটি সুপার টাইফুনে পরিণত হয়েছিল। দুর্বল হয়ে এলেও ঝড়টির কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৯১ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠছে বলে জানিয়েছে তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসন (সিডব্লিউএ)।
সিডব্লিউএর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ঝড়টির অবস্থান ছিল তাইওয়ানের পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এটি শুক্রবার রাতে তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছ দিয়ে অতিক্রম করে চীনের উপকূলের দিকে উত্তরমুখী হতে পারে। পরে দক্ষিণ জাপানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিতে তাইওয়ানে একজনের মৃত্যু এবং ১৬৩ জন আহত হয়েছেন। এর আগে আহতের সংখ্যা ১৭১ বলা হলেও পরে তা সংশোধন করা হয়। পাহাড়ি এলাকা থেকে ২ হাজার ৬৩৯ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তাইপাওয়ার জানিয়েছে, ঝড়ের কারণে ৭৭ হাজারের বেশি বাড়িতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে বেশির ভাগ এলাকায় ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু করা হয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি জানিয়েছে, তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং ঝড়ের কারণে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়েনি।
তাইওয়ানের আবহাওয়াবিদ লিউ পেই-তেং রয়টার্সকে বলেন, ঝড়টি তাইওয়ানের কাছে এসে থেমে গেলে, ঘুরপাক খেলে কিংবা এদিক-ওদিক দিক পরিবর্তন করলে সরাসরি স্থলভাগে আঘাত হানার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর বড় ঝড়গুলোর মধ্যে চাম্পির বাতাসের বিস্তৃতি অন্যতম। ঝড়টির গতি কমে গেলে তাইওয়ানে দীর্ঘ সময় ধরে প্রবল বাতাসের প্রভাব থাকতে পারে।
উপকূলীয় শহরগুলোতে মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। এতে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতির দমকা বাতাসের আশঙ্কার কথা জানিয়ে বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া তাইপেইয়ের আশপাশসহ উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় এক মিটার বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইলান কাউন্টিতে বাতাসের গতি ও বৃষ্টিপাত বাড়তে থাকায় কর্তৃপক্ষ বালুর বস্তা বিতরণ করেছে। পাশাপাশি উভচর যান ও ফোলানো যায় এমন উদ্ধারকারী নৌকা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সুয়াও বন্দর শহরের প্রধান লি মিং-চেন বলেন, প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনীকে উদ্ধারকাজে যুক্ত করা হবে। মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় উভচর যান ব্যবহার করা হতে পারে।
অন্যদিকে, উত্তরের বন্দরনগরী কিলুংয়ে নৌকার মালিকেরা নিজেদের নৌযান নিরাপদে বাঁধার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দা ১৮ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক লিউ ইউ-এন বলেন, ঝড় খুব বেশি ভয়াবহ মনে না হলেও বন্যার আশঙ্কা করছেন তিনি। চলতি বছর কিলুংয়ে একাধিকবার বন্যা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তাইওয়ানের আবহাওয়াবিদদের হিসাবে, চাম্পির বাতাসের বিস্তৃতি প্রায় ৩২০ কিলোমিটার। ফলে ঝড়টি দ্বীপটির অধিকাংশ এলাকা প্রভাবিত করতে পারে। আবহাওয়াবিশেষজ্ঞদের ধারণা, এর প্রভাব প্রায় দুই দিন স্থায়ী হতে পারে।
ঝড়ের কারণে শুক্রবার তাইওয়ানের আর্থিক বাজারও বন্ধ রাখা হয়। তবে চীনের উপকূলের কাছাকাছি অবস্থিত তাইওয়ান-নিয়ন্ত্রিত কিনমেন দ্বীপপুঞ্জে স্কুল ও সরকারি-বেসরকারি অফিস স্বাভাবিকভাবে খোলা ছিল।
পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার সব ২৬২টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি বাতিল হয়েছে ৭১৭টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। তবে উত্তর থেকে দক্ষিণে চলাচলকারী উচ্চগতির রেলসেবা স্বাভাবিক ছিল।
রাজধানী তাইপেইয়ে দমকা হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি হলেও মেট্রোরেলসহ গণপরিবহন সীমিত পরিসরে চালু ছিল।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় তাইওয়ান সাধারণত ভালো প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। এর ফলে প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক কম রাখা সম্ভব হয়। গ্রীষ্মকালে এ ধরনের ঝড় বেশি দেখা গেলেও শরৎকালেও ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, চাম্পি প্রথমে জাপানের ওকিনাওয়া অঞ্চলের সবচেয়ে পশ্চিমে অবস্থিত জনবসতিপূর্ণ দ্বীপ ইয়োনাগুনির ওপর দিয়ে অতিক্রম করতে পারে। এরপর ঝড়টির গতিপথ ও শক্তির পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী পরিস্থিতি।
সূত্র: রয়টার্স