কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় আগুনের সূত্রপাত নিয়ে প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের বিষয়টি সামনে এসেছে। পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির সদস্যদের ধারণা, নিচতলার একটি ফ্রিজে শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাতের পর রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। পরে গুদামে থাকা দাহ্য পদার্থ, কাঠের অবকাঠামো ও তীব্র বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।
গত ১৭ অক্টোবর সকালে উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভের পাশে তিনতলা টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। পরে সেখান থেকে ১০ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত রিসোর্টটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার আটটি কক্ষে পর্যটকেরা অবস্থান করছিলেন। নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ ও কর্মীদের থাকার জায়গা।
ঘটনার পর রিসোর্টের মালিক ও মামলার প্রধান আসামি মো. তানভীর সুলতান মিয়া পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার দাবি, তিনি বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থান করছেন। অপর মালিক নেওয়াজ মোরশেদসহ অন্যরাও আত্মগোপনে রয়েছেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ। তবে রিমান্ডের শুনানি এখনো হয়নি।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, গ্রেপ্তার সহকারী ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে নিচতলার একটি ফ্রিজে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট হয়। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে আগুন রান্নাঘরে ছড়িয়ে পড়লে গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে।
ওসি আরও জানান, রিসোর্টের একটি গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ ছিল বলে জানা গেছে। এর সঙ্গে কাঠের তৈরি বিভিন্ন অংশ ও বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে গুদামে ঠিক কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ জানান, আগুনের সূত্রপাত নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।
অগ্নিকাণ্ডের পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানান, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের পর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে সামনে এসেছে। বিস্তারিত তদন্ত শেষে প্রতিবেদনে প্রকৃত কারণ উল্লেখ করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের সময় বিকট শব্দ শোনা যায়। রিসোর্টের পাশের চা-কফির দোকানের মালিক গিয়াস উদ্দিন জানান, শব্দ শুনে বাইরে এসে তিনি রিসোর্টে আগুন দেখতে পান। এ সময় আশপাশে থাকা মানুষজন ছোটাছুটি করছিলেন। আগুনে তাঁর দোকানের একটি ফ্রিজ ও কাঠের কিছু অংশও পুড়ে যায়। জালিয়াপালং ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপি কমান্ডার মোহাম্মদ আজিজও বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। তবে ওই শব্দের উৎস নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
প্রায় ২০ শতক জমির ওপর নির্মিত রিসোর্টটির মেঝে, দেয়াল ও সিঁড়ির বড় অংশ কাঠ দিয়ে তৈরি ছিল। সড়কের পাশে গাছের খুঁটির ওপর রেস্তোরাঁর একটি বর্ধিত অংশও নির্মাণ করা হয়েছিল। আগুনে এসব কাঠামোর বড় অংশ পুড়ে যায়।
শুধু ট্রেড লাইসেন্সে চলছিল ব্যবসা
টুপটুপ রিসোর্টটি জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল। গত ২২ জুলাই রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়ার নামে লাইসেন্সটি দেওয়া হয়। এতে তাঁর ঠিকানা চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মীরপাড়া উল্লেখ করা হয়েছে।
লাইসেন্সটির মেয়াদ চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। লাইসেন্স বাবদ ৫০০ টাকা, মূল্য সংযোজন কর ৭৫ টাকা এবং বাণিজ্যিক কর ১ হাজার ৪২৫ টাকা—সব মিলিয়ে ২ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।
জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম ছৈয়দ আলম জানান, ইউনিয়ন এলাকায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ফি নিয়ে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়। টুপটুপ রিসোর্টের ক্ষেত্রেও একইভাবে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। তবে অগ্নিকাণ্ডের পর জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না।
রিসোর্টে কতজন ছিলেন, তা নিয়ে ভিন্ন তথ্য
অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে কতজন পর্যটক ছিলেন, তা নিয়ে স্বজন ও পুলিশের বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
স্বজনদের দাবি, ১৬ অক্টোবর রাতে নারী ও শিশুসহ মোট ২১ জন পর্যটক রিসোর্টটিতে অবস্থান করছিলেন। পরদিন সকালে দুজন সৈকতে যাওয়ায় আগুন লাগার সময় রিসোর্টে ১৯ জন ছিলেন। তাঁদের হিসাবে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, ছয়জন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং দুজন লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। এ হিসাবে আরও একজনের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে স্বজনেরা দাবি করেন।
তবে উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান জানান, প্রাথমিক তদন্ত এবং গ্রেপ্তার সহকারী ব্যবস্থাপকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার সময় আটটি কক্ষে ১৯ জন অতিথি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত সাতজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং দুজন লাফ দিয়ে নিরাপদে বের হয়ে আসেন। এই ১৯ জনের বাইরে আর কেউ নিখোঁজ রয়েছেন—এমন তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়নি।
জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, ১০টি মরদেহ উদ্ধারের পর আরও একজন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি সামনে এসেছিল। পরে ফায়ার সার্ভিস আবারও ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালালেও আর কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে পর্যটকদের ভিড়
অগ্নিকাণ্ডের পরও পোড়া রিসোর্টটি দেখতে ঘটনাস্থলে আসছেন অনেক পর্যটক। মেরিন ড্রাইভ দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকে গাড়ি থামিয়ে ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। স্থানীয় দোকানিদের কাছ থেকেও আগুনের ঘটনা ও প্রাণহানির বিষয়ে জানতে চাইছেন তাঁরা।
ঘটনাস্থলে আসা কয়েকজন পর্যটক রিসোর্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদনের বিষয়টি কঠোরভাবে তদারক করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি এড়ানো যায়।
অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা, অনুমোদন এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত শেষ হলে আগুনের প্রকৃত কারণ এবং দায় নির্ধারণে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
