সৌদি আরবে মক্কায় কথিত অনৈতিক কাজের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নজরুল ইসলামের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছেন, তার পিতা আব্দুল বাছির ও মা রেহানা বেগম। ছেলের এমন করুণ মৃত্যুতে শোকে কাতর পিতা মাতা ছেলের মুখটি একবার দেখতে চান।
নজরুলের বাবা আব্দুল বাছির বলেন, ‘ছেলে হারিয়েছি, এ খবর শুনে বোনও মারা গেছে। আমি সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব। পরিবারকে না জানিয়ে এভাবে একটি মৃত্যুদণ্ড কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। কাউকে না জানিয়ে একটি মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হলো অথচ আমাদের দেশের কনসুলেট এ বিষয়ে কিছুই জানে না। তারা কেন এ বিষয়ে জানল না।’
পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বিদেশের মাটিতে জেলে থাকা তাদের নাগরিকদের প্রতিনিয়ত খোঁজ খবর রাখে। অথচ গত ১৪ অক্টোবর কাউকে না জানিয়ে সৌদিতে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। নজরুল ইসলামের বাবা আব্দুল বাছির অনেকটা ক্ষোভ ঝেড়েই এ কথাগুলো বলছিলেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নজরুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের আবদুল বাছির ও রেহেনা বেগম দম্পতির ৪ সন্তানের মধ্যে সবার বড়।
পরিবার জানায়, নজরুল ইসলাম এসএসসি পাস করে পরিবারের হাল ধরতে ২০২২ সালে সৌদি আরবে যান। সেখানের মক্কা নগরীর হেরাম শরিফে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ পান। সাত মাস পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে হঠাৎ একদিন তার ছেলে জেলখানা থেকে ফোন দিয়ে জানায় সে কারাগারে বন্দি। তবে কি কারণে সে বন্দি সে বিষয়টি সে জানায়নি। গেল রোববার সবশেষ নজরুলের সাথে কথা হয় পরিবারের। পরে গণমাধ্যমের খবরে জানতে পারেন বুধবার ১৪ অক্টোবর নজরুলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, তিন বছরের বেশি সময় সেখানে সে আটক থাকার পর গেল বুধবার ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ কনসুলেট কিংবা পরিবারকে না জানিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এ অবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের কার্যকরের আগে নজরুল ইসলামকে আইনি সহায়তার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না কিংবা বাংলাদেশ কনসুলেটের ভূমিকা কি ছিল তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নজরুলের বাবা-মা।
নজরুলের বাবা আবদুল বাছির বলেন, ২০২২ সালে ৭ লাখ টাকা ঋণ করে নজরুলকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার এক মাস পর মক্কার হেরাম শরিফে সে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ পায়। তবে ৭-৮ মাস পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। আটকের প্রায় দেড়মাস পর নজরুল সে দেশের জেল থেকে আমাকে ফোন দিয়ে জানায় সে সেখানে কারাবন্দি। তবে কি কারণে তাকে আটক করা হয়েছে, সে এই বিষয়ে কিছু জানায়নি কিংবা আমরাও জানিনা।
তিনি বলেন, প্রায় তিন বছর তিন মাস ধরে সে কারাগারে ছিল। গত রবিবার সে আমাকে ফোন দেয় । সে জানায় সে সমস্যার মধ্যে রয়েছে। এটাই তার সাথে আমার শেষ কথা। গত বুধবার শুনলাম নজরুলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমি এই বিষয়ে আর কিছু বলতে পারিনা। বাড়িতে এখন কান্নার রোল। আমার বোন আবেদা বেগম বাড়িতে এসে নজরুলের মৃত্যুর খবর শুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।’
‘আমার ছেলেও গেলো, বোনও গেলো সব হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। আমি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তিনি আরো বলেন, নজরুল কারাগারে থাকার সময় তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার কাছে বাংলাদেশ কনসুলেট থেকে কেউ যোগাযোগ করেছে কিনা কিন্তু কেউ তার সাথে যোগাযোগ করেনি।’
আবদুল বাছির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতিটি দেশের কনসুলেট জেলে থাকা তাদের নাগরিকদের খোঁজ খবর নেয়। অথচ আমাদের দেশের কন্স্যুলেট থেকে তার কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি। আমরা কি দেশে বাস করছি। আমার ছেলেকে যেই অভিযোগে নেয়া হয়েছে সে বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য কোনো আইনজীবী পেয়েছিলেন কিনা অথবা কনসুলেটের সাথে যোগাযোগের সুযোগ হয়েছে কিনা তাও এখন বড় প্রশ্ন। আমার ছেলের মতো আর কেউ যেন এভাবে মরতে না হয়। সে দেশে যারা আছেন তাদের যেন আমাদের দেশের সরকারের পক্ষ থেকে খোঁজখবর নেওয়া হয়।’
এদিকে তার মৃত্যুর খবর যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা পরিবারের লোকজন। তার মৃত্যুর খবরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তার ফুফুও। বাড়িজুড়ে চলছে শোকের মাতম।
নজরুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিদেশের মাটিতে না জানিয়ে ছেলের মৃত্যুদণ্ডের খবরে শোকে স্তব্ধ বাবা-মা। একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান হারানোর বেদনা কিছুতে মানতে পারছেন না তারা। গেল ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কায় কথিত অনৈতিক কাজের অভিযোগে নজরুল ইসলামসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সে দেশের সরকার, যা পরিবার জানতে পারেন গণমাধ্যমের খবরে।
এদিকে নজরুলে মৃত্যুর খবরে শোক সইতে না পেরে সেদিনই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। এমন করুণ পরিণতিতে গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজন ও এলাকাবাসী শোকার্ত মা-বাবার পাশে থাকতে তার বাড়িতে ভিড় করছেন। স্থানীয়রা জানান, বাংলাদেশ সরকারকে না জানিয়ে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এমন মৃত্যুদণ্ড মেনে নেওয়া যায় না।
জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানান, মরদেহ ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। মরদেহ দেশে ফিরলে ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা করা হবে।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত নজরুল ইসলামের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে- এমনটাই প্রত্যাশা পরিবারের।
