আমন ধানের ভালো ফলন পেতে বৃষ্টির ওপর অনেকটা নির্ভর করতে হয় কৃষকদের। আমনের মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হলে প্রয়োজন হয় সেচ দেওয়ার। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। রংপুর ও হবিগঞ্জে বৃষ্টির অভাবে ক্ষেতে রোপণ করা ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। অনাবৃষ্টিতে শুকিয়ে যাচ্ছে আমন ধানের ক্ষেত। কোথাও কোথাও জমিতে দেখা দিয়েছে ফাটল। আমনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে পানির সংকট নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় রোপা আমনের জমিতে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। কোথাও কোথাও জমির মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। এতে ধানের স্বাভাবিক ফলন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় জমির আর্দ্রতা কমে গেছে। তীব্র রোদ ও গরমে মাটি শুকিয়ে যাওয়ায় ধানগাছ সতেজ রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় অনেক কৃষক সেচের মাধ্যমে জমিতে পানি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে, বাড়তি সেচের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বৃষ্টি না হলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২৫ হাজার ৫৯৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে। উপজেলার পীরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কৃষক সফু মিয়া বলেন, ধানের জমিতে পানি নেই। বাধ্য হয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
রায়পুরের কৃষক মজনু মিয়া বলেন, জমির মাটি ফেটে গেছে। ধানগাছের বৃদ্ধি আগের মতো নেই। এখন বৃষ্টি ছাড়া উপায় দেখছি না। আমন ধান আমাদের সারাবছরের খাদ্য ও আয়ের অন্যতম ভরসা। কুমেদপুর ইউনিয়নের চন্ডিপুর গ্রামের কৃষক রিপন মিয়া বলেন, এ সময় আমন ধানের জমিতে প্রচুর পানির প্রয়োজন। ধানগাছে শিষ বের হওয়ার সময় এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এবার বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় জমিতে প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। পৌরসভার কৃষক রানু মিয়া বলেন, আমন ধানের আবাদে ধানগাছে শিষ বের হওয়ার সময় জমিতে পানির প্রয়োজন আরও বেড়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে জমিতে পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে সেচ দিতে গেলে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যায়। কৃষকরা অনেক আশা নিয়ে ধান চাষ করেন, কিন্তু আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে সেই আশা পূরণ নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুমন আহমেদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে হবে এবং জমির আর্দ্রতা ধরে রাখতে হবে। আমরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। বৃষ্টিপাত হলে ধানের ক্ষতি অনেকটাই কমে আসবে।
লাখাই (হবিগঞ্জ): উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নেই কমবেশি আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে করাব, মুড়াকরি, বামৈ ও মুড়িয়াউক ইউনিয়নে আবাদ বেশি। অনাবৃষ্টিতে জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। পর্যাপ্ত পানি ও পরিচর্যা নিশ্চিত করা না গেলে ফলন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে লাখাইয়ে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। তবে, সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় দুই হাজার হেক্টর বেশি জমিতে এবার আমন ধানের চাষ হয়েছে। হুসেনপুর গ্রামের কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, বৃষ্টি না হওয়ায় জমির মাটি শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। ধানগাছ ঠিকমতো বেড়ে উঠছে না। জমিতে পানি দিতে না পারলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার সেচ দিতে গেলেও বাড়তি খরচ হচ্ছে। এর মধ্যে পোকার আক্রমণ বাড়লে লোকসানের আশঙ্কাও বাড়বে। করাব গ্রামের কৃষক ভিংরাজ মিয়া বলেন, আমন ধানের ওপর নির্ভর করেই আমরা সারাবছরের খরচের হিসাব করি। এবার বেশি জমিতে ধান চাষ করেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় দুশ্চিন্তায় আছি। একদিকে সেচের খরচ, অন্যদিকে ধানে পোকার আক্রমণ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে।
কৃষক গোপাল চন্দ্র দেব বলেন, ধানের ক্ষেত বাঁচাতে সেচের পাশাপাশি পোকামাকড়ের দিকেও নজর রাখতে হচ্ছে। পানির সংকট থাকলে ধানের পরিচর্যা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার পোকার আক্রমণ ঠেকাতে বাড়তি খরচ করতে হয়। এ অবস্থায় কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রয়োজন। লাখাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহাদুল ইসলাম বলেন, আমরা বিদ্যুৎ অফিসকে অনুরোধ করেছি- যেসব এলাকায় সেচ পাম্প রয়েছে, সেসব এলাকার কৃষকরা বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন করলে যেন দ্রুত সংযোগ দেওয়া হয়। এদিকে, কৃষকদের দাবি, সেচের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ দ্রুত নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে ধানের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও মাজরা পোকার আক্রমণ দমনে কার্যকর পরামর্শ দিতে হবে। সময়মতো সেচ ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত না হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ফসলহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
