সম্প্রতি সকলের প্রিয় ‘মা-মাসি কিচেন’-এর উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছে। গত আগস্ট মাসে সকলের পরিচিত ‘দাদু’ জ্যোতি প্রসাদ বসু পাড়ি দিয়েছেন চিরঘুমের দেশে। অতঃপর আর পাঁচটা পুজোর মতো এবারে উৎসবের প্রহর দুয়ারে কড়া না নাড়লেও ‘দিদা’ সুমিতা বসু কিন্তু দর্শককে নিরাশ করেননি। পুজোর দিনগুলির জন্য সহজ পদের সম্ভার নিয়ে হাজির তিনি। স্বামীকে ছাড়া প্রথম পুজো। কীভাবে কাটাবেন? সংবাদ প্রতিদিন-এর মুখোমুখি হয়ে জানালেন মা-মাসির কিচেনের ‘দিদা’ সুমিতা বসু।
“এবছর বিষয়টা একটু অন্যরকম। সকলেই জানেন, আমার স্বামী চলে যাওয়ার পর পুজোতে আর আলাদা করে তেমন কিছু করার উৎসাহ পাচ্ছি না। তবুও আমার দর্শকদের একেবারে নিরাশ করব না।…”
স্বামী না থাকলেও খুদে নাতনিই এখন দিদার সাপোর্ট সিস্টেম। দিদার কাছে ইতিমধ্যেই রসনাতৃপ্তি আর ঘোরার চুক্তি করে ফেলেছে সে। কথাপ্রসঙ্গে এবারের পুজোর কথা জিজ্ঞেস করতেই সুমিতা বসু জানালেন, “আগে তো পুজো হইচই করেই কাটত। তবে গত কয়েক বছর কম বেরতাম। বয়স হওয়ায় ভিড়ে বেরতাম না। সকালে হয়তো মণ্ডপে বসতাম। দুপুরে খাওয়ার পর স্বামীকে নিয়ে গাড়িতে করে বেরতাম। এলাকার সব মণ্ডপে ঘুরে ৬টায় বাড়ি ফিরতাম। গাড়িতে বসে যতটা দেখা যায় আর কী। তারপর কোনও কফিশপে কফি খেয়ে বাড়ি চলে আসতাম। তারপর সন্ধেবেলা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে কাটত। এবছর নাতনি বায়না করেছে, ওকে নিয়ে বেরতে হবে। যাব, তবে কতটা কী করতে পারব জানি না। আমাদের পাড়ার প্যান্ডেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, সেগুলো দেখি। এত স্টল হয়, সেগুলোয় যাই। ছোটখাট মেলা বসে। সেখানে ঢুঁ মারি। নাতনির সঙ্গে আমার এটাই চুক্তি। এবারও সেটাই করব।”
আর পুজোর ভুরিভোজ? মা-মাসির কিচেনের ‘দিদা’র সহজ সুপাচ্য রান্নার জন্য অনেকেই অপেক্ষা করবেন। তাদের কোন রান্না শেখাবেন? প্রশ্ন শুনেই সুমিতা বসু বললেন, “বাঙালির পুজো মানেই ভুরিভোজ, প্রতিবছর আমার বাড়িতেও তার ব্যতিক্রম হয় না। তবে এবছর বিষয়টা একটু অন্যরকম। সকলেই জানেন,আমার স্বামী চলে যাওয়ার পর পুজোতে আর আলাদা করে তেমন কিছু করার উৎসাহ পাচ্ছি না। তবুও আমার দর্শকদের একেবারে নিরাশ করব না। এবার ছোটখাটো কিছু রেসিপি করছি। যেমন কিমা ভাত, তেল কই, লুচি ছোলার ডাল, পোস্ত বড়া, আলুর দম- যেসব রেসিপিগুলো খুবই সাধারণ, সেগুলোই পুজোর জন্য করছি। আমাদের বাড়িতে পুজোর বিশেষ রান্নাবান্না হল- অষ্টমীতে লুচি-ফুলকপি। এটা করতেই হবে। তাছাড়া নবমীতে মাংস। আর দশমীতে নানারকম মিষ্টির পদ। এগুলো থাকবেই। তারপরে যতরকম সুস্বাদু ভালো খাওয়াদাওয়া- সেগুলো এযাবৎকাল নিজেরা বসেই ঠিক করে নিতাম।”
আগে পুজো কেমন কাটত? স্মৃতির সরণিতে হেঁটে মা-মাসির কিচেনের ‘দিদা’ হেঁটে গেলেন স্বামীর সঙ্গে কোয়াটারে থাকার দিনগুলিতে। তাঁর কথায়, বিয়ের পর আমরা যখন কোয়াটারে ছিলাম তখন ওখানকার পুজোয় একদিনই খিচুড়ি খাওয়ানো হত। সেটা পংক্তিভোগে আমরা খুব আনন্দ করে খেতাম। তাছাড়া বাড়িতে নানা পদ রান্না করে পুজোর আগেই স্টক করে নিতাম। একেবারে ষষ্ঠী থেকেই আমার ফ্রিজে নানা পদের সম্ভার রেডি থাকত। কিছু কিছু রান্না খানিক এগিয়ে রাখতাম, যাতে পুজোর দিনগুলিতে খুব খাটনি না করে সহজেই বানিয়ে নেওয়া যায়। পরের দিকে আমরা বাড়ি করে ব্লকে আসার পর এখানে ৩ দিন খাওয়াদাওয়া। সেদিনগুলিতে আবার রকমারি পদ থাকত। আর পংক্তিভোজ এত ভালো লাগে যে ওটা ছাড়তে ইচ্ছে করে না। আবার পুজোর দিনে বাড়ির খাবারও মিস করা যাবে না। তাই পুজোতে আমাদের জলখাবারের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ থাকত। লুচি, পরোটা- এগুলো বাঁধাধরা। তারপরে দুপুরে প্যান্ডেলে খেতাম। আর রাতে কিনে খাওয়ার একটা চল। ষষ্ঠী আর দশমীতে যেমন রকমারি রান্নাবান্না করা হত প্রতিবছর। এবছর আর সেভাবে কিছু করব না। তবে নাতনি আছে, ওর বায়না মেটাতেই হবে। ওদের অবশ্য কেনা খাবারে বেশি ঝোঁক। তবে দশমীতে নারকেল নাড়ু, তক্তি, ক্ষীরের নাড়ু, কুচো নিমকি, জিভে গজা, এসব খাস্তা সমস্ত যেগুলো তৈরি হয়, এগুলো পুজোর সময়েই করে রাখতাম। ওটাই আমার বড়কাজ ছিল।”
এবারে মায়ের কাছে কী চাইবেন? প্রবীণ হেঁশেল ইনফ্লুয়েন্সার বললেন, “মা উমার কাছে এটাই প্রার্থনা করব যে, সকলে যেন সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে একটা সুন্দর পৃথিবীতে সুখে-শান্তিতে, আনন্দে সারাবছর কাটাতে পারে। এই পৃথিবী যেন আমাদের বাসযোগ্য থাকে। আমরা যেন খেয়েপড়ে সুখেশান্তিতে থাকতে পারি।”
