ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় সাড়ে ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা দুটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাযন্ত্র বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে ক্যান্সার চিকিৎসার সাড়ে ১৪ কোটি টাকার লিনিয়ার এক্সিলারেটর এখনো বাক্সবন্দি, আর ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকার ক্যাথল্যাব স্থাপনের প্রায় ৯ বছরেও চালু হয়নি। যন্ত্র দুটি চালু না করেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের পুরো বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া চিকিৎসাসামগ্রী কেনা, অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া আদায় ও হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়মের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে ফরিদপুরে দুদকের জেলা সমন্বিত কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. মোস্তাফিজ। টানা দুই দিনের অভিযানে পাওয়া অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে সোমবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ অভিযান চালায় দুদকের আট সদস্যের একটি দল। চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে রোগীদের হয়রানি, দালাল চক্রের মাধ্যমে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো, আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ, কেনাকাটা এবং অন্যান্য অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে হাসপাতালের ক্যান্সার ইউনিটের জন্য প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি লিনিয়ার এক্সিলারেটর আনা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ না করেই যন্ত্রটি কেনা হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এটি বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। একই অর্থবছরে কার্ডিওলজি বিভাগের জন্য ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ক্যাথল্যাব স্থাপন করা হলেও সেটি আজ পর্যন্ত চালু হয়নি। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, যন্ত্র দুটি কার্যকর না করেই সংশ্লিষ্ট দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
দুদক কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজ বলেন, এসব ঘটনায় সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো অধিকতর যাচাই-বাছাই করে দায়ীদের চিহ্নিত করার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালের এমএসআর (চিকিৎসাসামগ্রী) কেনাকাটায়ও তথ্যের গরমিল পেয়েছে দুদক। অভিযানে ফেব্রিক্স নামের একটি ওষুধের ৭৬২ বোতল ঘাটতি এবং হেক্সাটন নামের ওষুধের অতিরিক্ত বোতল পাওয়া গেছে। বিষয়টিকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে দুদক কর্মকর্তা জানান, এ-সংক্রান্ত নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের সিটিস্ক্যান ও এক্স-রে পরীক্ষা বন্ধ থাকার বিষয়েও অনুসন্ধান করেছে দুদক। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এমএসআর কেনার কার্যাদেশে সিটিস্ক্যান ও এক্স-রে ফিল্ম অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেগুলো সরবরাহ করেনি বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে এসব সামগ্রী বাদে বাকি পণ্যের বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান দুদক কর্মকর্তা।
হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া আদায় নিয়েও অনিয়মের তথ্য পেয়েছে দুদক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক মাসে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার কোনো অর্থ জমা হয়নি।
দুদক কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালে পাঁচটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এর মধ্যে দুটি নষ্ট, বাকি তিনটি চালু। তবে চালু অ্যাম্বুলেন্সগুলো থেকে ভাড়া আদায় হলেও সেই অর্থ জমা পড়েনি বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টিতে অনিয়মের ইঙ্গিত রয়েছে। পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ে জনবল নিয়োগ-সংক্রান্ত নথিপত্রও সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি।
মো. মোস্তাফিজ বলেন, অভিযানে পাওয়া প্রতিটি অনিয়মের রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। নথি বিশ্লেষণ করে দায় নির্ধারণের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদন প্রধান কমিশনারের কাছে পাঠানো হবে।
দুদকের অভিযানে উঠে আসা অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানষ কৃষ্ণ কুন্ডু বলেন, দুদক যেসব তথ্য ও নথিপত্র চেয়েছে, সেগুলো দিয়ে তারা সহযোগিতা করেছেন। চিকিৎসাযন্ত্র দুটি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে রয়েছে এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
তবে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া জমা না হওয়ার তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। এমএসআর কেনাকাটায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তার জানা নেই বলেও জানান হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক।
দুদক জানিয়েছে, সংগ্রহ করা নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে অনিয়মের সঙ্গে কারা জড়িত, তা নির্ধারণ করে পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
