ব্রণ সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত সময়ে দেখা দিতে পারে, যখন মনে হয় ত্বক স্বাভাবিক হয়ে আসছে। অনেক নারীর ক্ষেত্রে মাসিক শুরুর ঠিক আগের দিনগুলোতে এমনটি ঘটে। ত্বকের নিয়মিত যত্ন নেওয়ার পরও চিবুক বা চোয়ালের আশপাশে লাল ও বেদনাদায়ক ব্রণ দেখা দিতে পারে।
বারবার এমন ব্রণ ওঠার সঙ্গে মাসিক চক্রজুড়ে হরমোনের স্বাভাবিক ওঠানামার সম্পর্ক রয়েছে। হরমোনের পরিবর্তনের কারণে লোমকূপ বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং ত্বকে তেল উৎপাদন বেড়ে যেতে পারে। এসব পরিবর্তন কখন ঘটে, তা জানা থাকলে ব্রণ ওঠার সময় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া এবং তা নিয়ন্ত্রণে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
মাসিকের আগে ব্রণ হওয়া একটি সাধারণ সমস্যা। এটি সাধারণত হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হয়, অপরিচ্ছন্নতার জন্য নয়। মাসিক শুরুর আগের দিনগুলোতে হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন আসে। এর ফলে ত্বকের তৈলাক্ততা বাড়তে পারে এবং ব্রণ দেখা দিতে পারে।
ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন ও অ্যান্ড্রোজেনের মতো হরমোনের পরিবর্তন মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে ত্বকের তেল উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। অ্যান্ড্রোজেনের প্রভাবে তৈলগ্রন্থি থেকে সিবাম তৈরি হয়। এটি এক ধরনের প্রাকৃতিক তেল, যা ত্বককে সুরক্ষা দেয়। তবে অতিরিক্ত সিবাম মৃত ত্বকের কোষের সঙ্গে মিশে লোমকূপ বন্ধ করে দিতে পারে। এর ফলে ত্বকে প্রদাহ ও ব্রণ দেখা দেয়।
ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে গেলে অ্যান্ড্রোজেনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি লক্ষণীয় হতে পারে। অ্যান্ড্রোজেন ত্বকের তৈলগ্রন্থিকে বেশি সিবাম উৎপাদনে উদ্দীপিত করে। অতিরিক্ত তেল মৃত ত্বকের কোষের সঙ্গে মিশে লোমকূপ বন্ধ করে দেয়। এরপর বন্ধ লোমকূপের ভেতরে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি ও প্রদাহের কারণে ব্রণ তৈরি হতে পারে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস’-এর একটি পর্যালোচনায় হরমোন, খাদ্যাভ্যাস ও জিনগত কারণ কীভাবে ব্রণ তৈরিতে ভূমিকা রাখে, তা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তেল উৎপাদন বাড়াতে অ্যান্ড্রোজেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, উচ্চ গ্লাইসেমিক সূচকযুক্ত খাবার ব্রণের সমস্যা বাড়াতে পারে।
এক রাতের মধ্যে ব্রণ দেখা দিলেও এর বিকাশ ত্বকের নিচে কয়েক দিন ধরে চলতে পারে। হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মাসিক শুরুর ঠিক আগে ব্রণগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
প্রোজেস্টেরনের পরিবর্তন ত্বক ও লোমকূপের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একটি ব্রণ তৈরি হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। তাই আজ যে ব্রণটি দেখা যাচ্ছে, সেটি হয়তো এক সপ্তাহ আগের হরমোনগত পরিবর্তনের সময় থেকেই ত্বকের নিচে তৈরি হতে শুরু করেছে।
এ কারণেই ব্রণ দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগাম যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি মাসে একই সময়ে ব্রণ ওঠার প্রবণতা থাকলে সম্ভাব্য সময়ের আগেই উপযুক্ত ত্বক পরিচর্যা শুরু করা যেতে পারে।
সাধারণত মাসিকের আগে চিবুক, চোয়ালের রেখা ও কখনো কখনো ঘাড়ে ব্রণ দেখা দেয়। এসব স্থান হরমোনের পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল হতে পারে। তবে শরীরের অন্য অংশেও ব্রণ হতে পারে। হরমোনজনিত ব্রণ অনেক সময় গভীর ও স্পর্শকাতর ফুসকুড়ির মতো হয়। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো হোয়াইটহেডের মতোও দেখতে হতে পারে।
মাসিক চক্র চলাকালে ত্বকের পরিবর্তন একটি নির্দিষ্ট ধারায় ঘটতে পারে। তবে তা নারীভেদে আলাদা হয়।
মাসিক চক্রের প্রথম থেকে পঞ্চম দিন পর্যন্ত হরমোনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এ সময় ত্বক শুষ্ক বা খসখসে হতে পারে এবং আগে থেকে থাকা ব্রণগুলো ধীরে ধীরে সেরে উঠতে পারে।
ষষ্ঠ থেকে ত্রয়োদশ দিন পর্যন্ত, অর্থাৎ ডিম্বস্ফোটনের আগের সময়ে, ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়ে। এ সময় কিছু নারীর ত্বক আগের তুলনায় পরিষ্কার দেখাতে পারে।
চতুর্দশ থেকে একুশতম দিন পর্যন্ত, অর্থাৎ ডিম্বস্ফোটনের পর, প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বাড়তে পারে এবং ত্বকে তেল উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে। এ সময় লোমকূপ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে।
বাইশতম থেকে আটাশতম দিন পর্যন্ত, অর্থাৎ পরবর্তী মাসিক শুরুর আগে, হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন আসে। এ সময় ব্রণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
এগুলো আনুমানিক সময়সূচি, যা কেবল ধারণা পাওয়ার জন্য ব্যবহার করা উচিত। মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্য ও হরমোনের ধরন নারীভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই প্রতি মাসে একই দিনে ব্রণ দেখা নাও দিতে পারে।
ব্রণ নিয়ন্ত্রণে দিনে দুবার মৃদু ও তেলমুক্ত ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা উচিত। জোরে ঘষাঘষি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এমন প্রসাধনী ব্যবহার করা ভালো, যেগুলো লোমকূপ বন্ধ করে না। এ ধরনের পণ্যকে নন-কমেডোজেনিক বলা হয়।
মাসিক শুরুর আগে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড বা বেনজয়েল পারক্সাইডযুক্ত পণ্য সঠিকভাবে ব্যবহার করলে ব্রণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি সানস্ক্রিন ব্যবহার, ব্রণ টিপে বের না করা, নিয়মিত বালিশের কভার পরিবর্তন এবং মুঠোফোনের পর্দা পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
দুই থেকে তিন মাস মাসিক চক্র ও ত্বকের পরিবর্তন নিয়ে একটি ডায়েরি রাখলে ব্রণ ওঠার সময় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এতে আগেভাগে ত্বকের যত্ন নেওয়া সহজ হবে।
এ ছাড়া প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানো, মানসিক চাপ কমানোর কার্যকর উপায় খুঁজে নেওয়া এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ করা জরুরি। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়াও সহায়ক হতে পারে। ব্রণ দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, ব্যথা বাড়লে বা দাগ তৈরি হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এমএমটি
