শক্তিশালী টাইফুন চাম্পির প্রভাবে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে তাইওয়ান। শুক্রবার ঝড়টির প্রভাবে দ্বীপজুড়ে প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় দেশটির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে ৯৭৯টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। দুর্বল হয়ে এলেও ঝড়টি সরাসরি তাইওয়ানে আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ।
চাম্পি একপর্যায়ে সুপার টাইফুনে পরিণত হয়েছিল। চলতি বছর প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট সবচেয়ে শক্তিশালী ঝড়গুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। দুর্বল হয়ে এলেও ঝড়টির কেন্দ্রের কাছাকাছি বাতাসের দমকা গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৯১ কিলোমিটার রয়েছে।
তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসন জানিয়েছে, শুক্রবার ঝড়টি দ্বীপটির পূর্ব দিকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল। পূর্বাভাস অনুযায়ী, শুক্রবার গভীর রাতে এটি তাইওয়ানের উত্তরপূর্ব উপকূলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে চীনের উপকূলের দিকে উত্তরমুখী হবে। পরে ঝড়টি দক্ষিণ জাপানের দিকে এগিয়ে যাবে। এর আগে এটি জাপানের ওকিনাওয়া অঞ্চলের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত জনবসতিপূর্ণ দ্বীপ ইয়োনাগুনির ওপর দিয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিপাতে তাইওয়ানে একজন নিহত এবং ১৬৩ জন আহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা আগে ১৭১ জন বলা হলেও পরে তা সংশোধন করা হয়। দেশটির সরকার জানিয়েছে, পাহাড়ি এলাকা থেকে ২ হাজার ৬৩৯ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তাইপাওয়ার জানিয়েছে, ঝড়ের কারণে ৭৭ হাজারের বেশি বাড়িঘর বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে অধিকাংশ স্থানে এরই মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি জানিয়েছে, তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। ঝড়ের কারণে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়েনি।
তাইওয়ানের আবহাওয়াবিদ লিউ পেই তেং বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ঝড়টি তাইওয়ানের কাছে এসে থেমে গেলে, ঘূর্ণায়মান অবস্থায় থাকলে কিংবা এদিক ওদিক দুলতে থাকলে সরাসরি আঘাত হানার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিনি বলেন, ‘ঝড়টির বাতাসের বিস্তৃতি বেশ বড়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বড় ঝড়গুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। ঝড়ের গতি কমে গেলে তাইওয়ানে দীর্ঘ সময় ধরে প্রবল বাতাসের প্রভাব থাকবে।’
উপকূলীয় শহরগুলোতে মুঠোফোনে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতির দমকা বাতাসের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানী তাইপেইয়ের আশপাশসহ উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় এক মিটার বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় ইলান জেলায় প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিপাত বাড়তে থাকায় কর্তৃপক্ষ বালুর বস্তা বিতরণ করেছে। পাশাপাশি উভচর যান ও স্ফীত উদ্ধারকারী নৌকা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শুক্রবারের পরে ঝড়টি এ এলাকার কাছ দিয়ে অতিক্রম করার পূর্বাভাস রয়েছে।
আগের টাইফুনে ভয়াবহ বন্যার শিকার হওয়া বন্দরনগরী সুয়াওয়ের প্রধান লি মিং চেন বলেন, ‘প্রয়োজন হলে সামরিক বাহিনী মানুষকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসবে। সরিয়ে নেওয়া কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলায় উভচর যান ব্যবহার করা হবে।’
উত্তরের বন্দরনগরী কিলুংয়ে নৌযানগুলো নিরাপদে বেঁধে রাখতে ব্যস্ত সময় পার করেন মালিকেরা। নির্মাণশ্রমিক ১৮ বছর বয়সী লিউ ইউ এন বলেন, ‘পরিস্থিতি খুব ভয়াবহ নয়। তবে বন্যা নিয়ে চিন্তা হচ্ছে। এ বছর কিলুংয়ে অনেক বন্যা হয়েছে।’
তাইওয়ানের আবহাওয়াবিদদের তথ্য অনুযায়ী, টাইফুনটির বিস্তৃতি প্রায় ৩২০ কিলোমিটার। ফলে এর প্রভাব প্রায় পুরো তাইওয়ানজুড়ে পড়তে পারে। আবহাওয়াবিশেষজ্ঞদের ধারণা, ঝড়টির প্রভাব প্রায় দুই দিন স্থায়ী হতে পারে।
ঝড়ের কারণে শুক্রবার তাইওয়ানের আর্থিক বাজারও বন্ধ রাখা হয়েছে। দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৬২টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের পাশাপাশি ৭১৭টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। তবে উত্তর থেকে দক্ষিণে চলাচলকারী দ্রুতগতির রেলসেবা স্বাভাবিক রয়েছে।
রাজধানী তাইপেইয়ে দমকা বাতাসসহ বৃষ্টিপাত হলেও পাতালরেলসহ গণপরিবহন চালু ছিল। তবে সেবার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়।
টাইফুন মোকাবিলায় তাইওয়ান সাধারণত বেশ ভালোভাবে প্রস্তুত থাকে, যে কারণে প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে। গ্রীষ্মকালে এ ধরনের ঝড় বেশি দেখা গেলেও শরৎকালেও আঘাত হানতে পারে।
/অ
