আর্থিক সংকটে থাকা বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ গ্যারান্টির বিপরীতে ১০ শতাংশ সুদে তিন মাসের জন্য এ অর্থ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে তিন কর্মদিবসের মধ্যে সেই অর্থ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী খান বলেন, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংককে এ তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তিন মাস মেয়াদ শেষে ন্যাশনাল ব্যাংক টাকা ফেরত দিতে না পারলে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত অনুযায়ী তিন কর্মদিবসের মধ্যে সোনালী ব্যাংককে অর্থ পরিশোধ করবে। ফলে এ অর্থায়নে সোনালী ব্যাংকের কোনো ঝুঁকি নেই। এর আগে একই পদ্ধতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে অর্থ দেওয়া হয়েছিল।
একসময় বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর একটি ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে বড় পরিবর্তন আসে। পরে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ সিকদার পরিবারের হাতে চলে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিচালনা পর্ষদে আবার পরিবর্তন আসে। তবে আগের সময়ে সংঘটিত অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত দুর্নীতির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্যাংকটি।
উচ্চ খেলাপি ঋণ ও ধারাবাহিক লোকসানে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে তাতেও স্বাভাবিক লেনদেন পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
সম্প্রতি ন্যাশনাল ব্যাংকের চার আমানতকারী জমা টাকা তুলতে না পেরে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। পরে তাঁদের সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা উত্তোলন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
এ পরিস্থিতিতে গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হক। বৈঠকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান দাবি করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
গভর্নর ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি এবং আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানান। একই সঙ্গে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখা এবং ব্যাংকের কার্যক্রম সুশৃঙ্খল রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন। ১৫ অক্টোবর থেকে সব আমানতকারী যাতে চাহিদা অনুযায়ী টাকা তুলতে পারেন, তা নিশ্চিত করতেও নির্দেশ দেন তিনি।
এর আগে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৯৮৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। নির্ধারিত সময়ে ওই অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংককে ঋণের দায় মেটাতে হয়। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ওই অর্থ ঋণ হিসেবে দায় তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। মূল প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ অর্থের পুরোটাই নতুন টাকা সৃষ্টি করে সরবরাহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তারল্যসংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে অন্য ব্যাংক থেকে ধার নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে সাময়িকভাবে অর্থসংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটাতে খেলাপি ঋণ আদায়, নতুন করে খেলাপি ঋণ বাড়তে না দেওয়া এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় টেকসই উন্নতি নিশ্চিত করা জরুরি।
এসআই/বিআরইউ
