যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেস সচিব বা মুখপাত্র কেটি জাকারিয়ার আইনজীবী পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমোদন পেয়েছেন কি না, তার প্রমাণ এখনো প্রকাশ করেননি তিনি বা হোয়াইট হাউস। বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে তার যোগ্যতা তদন্তের দাবিও উঠেছে।
কেটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন। ফক্স নিউজ ও নিউজম্যাক্সের মতো রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমে রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে কাজ করার সময়ও তিনি এই পরিচয় ব্যবহার করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যে কিংবা চীনে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব বা মুখপাত্র হিসেবে প্রথম সংবাদ সম্মেলন করেন কেটি। তার বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার পর সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, কেটি কোথায় আইনজীবী হওয়ার পরীক্ষা দিয়েছেন। এ সময় ট্রাম্প তাকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ দেন।
জবাবে কেটি বলেন, ‘আমি যখন চীনে যাই…।’ তবে এরপর তিনি কী বলতে চেয়েছিলেন, তা স্পষ্ট হয়নি। চীনের জাতীয় আইন পেশাগত যোগ্যতা পরীক্ষা কেবল দেশটির নাগরিকেরাই দিতে পারেন।
কেটির শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস তার একটি লিখিত বক্তব্য দেয়। এতে বলা হয়, তিনি ২০০৭ সালে পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ২০১১ সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
বক্তব্যে কেটি বলেন, তিনি আন্তর্জাতিক লেনদেনসংক্রান্ত আইন নিয়ে কাজ করেছেন এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা তার রয়েছে। হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চিয়াংও তার পক্ষে বক্তব্য দেন। তিনি কেটিকে যোগ্য ও অত্যন্ত মেধাবী উল্লেখ করে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কাজ সম্পর্কে মার্কিন জনগণকে জানাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
কেটির পেশাগত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তার কর্মজীবনের তথ্য ঘিরেও। তার পেশাগত জীবনের বিবরণ অনুযায়ী, গত জুন থেকে তিনি ট্রাম্পের মালিকানাধীন ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপে জ্যেষ্ঠ যোগাযোগ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে দুই মাস যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দপ্তরে জনসংযোগবিষয়ক উপসহকারী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি চীনের বেইজিংয়ে ঝং লুন আইন প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক আইন বিভাগে সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন বলে তার পেশাগত পরিচিতিতে উল্লেখ রয়েছে। একই সময়ে তিনি অভিবাসী শ্রমিকদের শিশুদের সহায়তাকারী সংস্থা কমপ্যাশন ফর মাইগ্র্যান্ট চিলড্রেনে তহবিল সংগ্রহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বেও ছিলেন।
তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা রিচার্ড গ্রেনেলের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ফিক্স ক্যালিফোর্নিয়ার প্রধান আইন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন বলে তার পরিচিতিতে বলা হয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে তার কর্মজীবন ও যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামেও কেটি নিজের পরিচয়ে আইনজীবী শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ক্যালিফোর্নিয়া গ্লোব সংবাদমাধ্যমে তার লেখক পরিচিতিতে ফক্স নিউজ ও নিউজম্যাক্সের নিয়মিত ভাষ্যকার হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক করপোরেট আইন এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
নোভা রেড মাইনিং নামের একটি খনি প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা পর্ষদে তার নিয়োগের বিষয়ে ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতেও আন্তর্জাতিক আইন ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত কাজের অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়। সেখানে বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজের উল্লেখ ছিল।
ট্রাম্পও কেটিকে নিয়োগ দেওয়ার সময় তাকে আইনজীবী, পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং ফক্স নিউজ ও নিউজম্যাক্সের নিয়মিত ভাষ্যকার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের আইনজীবীদের সরকারি তথ্যভান্ডারে কেটি জাকারিয়ার নাম পাওয়া যায়নি। অঙ্গরাজ্যটির আইনজীবীদের নিবন্ধন ও অনুমোদন তদারককারী সংস্থার মুখপাত্র রিক কোকা জানান, কেটি জাকারিয়া কিংবা তার বিবাহপূর্ব নাম কেট শ্যারন ব্ল্যাকসহ নামের বিভিন্ন রূপে আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধনের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
স্বাধীন সংবাদমাধ্যম পপুলার ইনফরমেশন জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে খোঁজ নিয়েও তার আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধনের তথ্য পায়নি।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ক্যাম্পেইন ফর অ্যাকাউন্টেবিলিটি নামের একটি নজরদারি সংস্থা ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবী নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে অভিযোগ করে। তাদের দাবি, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকলে তা ক্যালিফোর্নিয়ার আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে। বিষয়টি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মিশেল কুপারস্মিথ বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় অনুমোদন ছাড়া নিজেকে আইনজীবী বলা নিছক বাড়িয়ে বলা নয়, বরং তা অপরাধ হতে পারে। তাই কেটি জনসাধারণকে তার যোগ্যতা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করেছেন কি না, তা তদন্ত করা উচিত।
ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবী নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, তারা অভিযোগটি পেয়েছে কি না কিংবা এ বিষয়ে তদন্ত চলছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারবে না। গোপনীয়তা-সংক্রান্ত আইনের কারণে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সূত্র: এপি
