বিশ্বের মানচিত্রজুড়ে আজ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব,
ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য এবং সীমান্ত উত্তেজনার এক অস্থির চিত্র বিরাজ করছে। ইউরোপের পূর্ব সীমান্তে চলা লড়াই থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার মহান হ্রদ অঞ্চলের প্রক্সি সংঘাত, প্রতিটি সংকটই বিশ্বশান্তি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমান সময়ের এমন ৯টি সংবেদনশীল ও আলোচিত সংঘাত নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন। বিস্তারিত জানাচ্ছেন
আজহারুল ইসলাম অভি
রাশিয়া-ইউক্রেন
ইউরোপের মানচিত্রে এখন সবচেয়ে বড় রক্তক্ষরণ চলছে পূর্ব সীমান্তে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার এই যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সমগ্র বিশ্বকে এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের ভূখণ্ডে এটিই সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত, যা ২০২২ সালের গোড়ার দিকে এক আকস্মিক পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে রূপ নেয়। দুই দেশের সীমান্তজুড়ে বর্তমানে যে লড়াই চলছে, তার মূল চালিকাশক্তি হলো ভারী আর্টিলারি গোলাবর্ষণ, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার এবং আধুনিক চালকবিহীন ড্রোন বা ইউএভির ব্যবহার। এই সংঘাতের পেছনের প্রেক্ষাপট বেশ দীর্ঘ ও জটিল। ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ এবং নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে সামনে এনে রাশিয়া ইউক্রেনে এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। অন্যদিকে, ইউক্রেন তাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রথম দিন থেকেই পশ্চিমা বিশ্বের সহযোগিতায় কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিয়েভকে কোটি কোটি ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে আসছে। এর বিপরীতে, মস্কো নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্থায়িত্ব বজায় রাখতে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছে। মাঠপর্যায়ের এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে সাধারণ মানুষ। লাখ লাখ ইউক্রেনীয় নাগরিক নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হতে বাধ্য হয়েছে। দুই পক্ষেরই সামরিক ও বেসামরিক ক্যাজুয়ালটির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্য ও জ্বালানি তেলের সরবরাহে যে মারাত্মক ধস নেমেছিল, তার রেশ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। কূটনীত ও সংলাপের টেবিলে সমাধানের কোনো লক্ষণ না দেখিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রটি এখন দীর্ঘস্থায়ী এক স্থবিরতার দিকে এগোচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখছে।
ইরান-ইসরায়েল
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে ছায়াযুদ্ধ বা পরোক্ষ সংঘাত চলে আসছিল, সাম্প্রতিক সময়ে তা চূড়ান্ত রূপ নিয়ে সরাসরি রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র সামরিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। আগে সাইবার হামলা, দেশের বাইরে গুপ্তহত্যা বা তৃতীয় কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তার মাধ্যমে হামলা চালানো হলেও এখন দুই দেশ সরাসরি একে অপরের জাতীয় ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন সামরিক ড্রোন দিয়ে হামলা চালাচ্ছে।
এই সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু দুটি ভিন্ন মতাদর্শিক ও সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি। ইসরায়েল তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ইরানকে এক অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং তাদের সীমান্তে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠীর শক্তিশালী অবস্থানকে নিজেদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র, পরমাণু গবেষণা অবকাঠামো এবং সিরিয়া বা লেবাননে অবস্থানরত শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সুনির্দিষ্ট বিমান ও ড্রোন আক্রমণ পরিচালনা করেছে।
অন্যদিকে, ইরান নিজেদের ভূখণ্ডের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে সরাসরি তাদের নিজ মাটি থেকে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি শত শত আত্মঘাতী ড্রোন ছোড়ে ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে। এই সরাসরি সামরিক দ্বন্দ্বে পুরো মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে এক ধরনের বিপজ্জনক সামরিক উত্তেজনার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।
এই সরাসরি লড়াইয়ের ফলে কেবল আঞ্চলিক সুরক্ষাই বিঘ্নিত হচ্ছে না, বরং বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক ও আকাশপথের অনিশ্চয়তা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের রুট বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে এবং বিশ্ববাজারে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের মূল্যে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। কোনো কূটনৈতিক মধ্যস্থতা সফল না হওয়ায় এই দুই বড় আঞ্চলিক শক্তির সরাসরি সংঘাত যেকোনো সময় আরও অনিয়ন্ত্রিত ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়ের রূপ নিতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক নতুন ও অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। এই সংঘাত সরাসরি দুই দেশের মূল ভূখণ্ডের মধ্যকার প্রচলিত যুদ্ধ না হলেও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, কৌশলগত জলপথ এবং তেহরান সমর্থিত বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীর হামলা-পাল্টাহামলার মধ্য দিয়ে এটি একটি স্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে। পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর ও লোহিত সাগরের কৌশলগত চোকপয়েন্টগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং ইরানের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নীতির মুখোমুখি অবস্থান পুরো অঞ্চলকে সব সময়ই বারুদস্তূপে পরিণত করে রেখেছে।
এই উত্তেজনার ঐতিহাসিক কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের দীর্ঘকালীন সামরিক হস্তক্ষেপ এবং এর বিপরীতে তেহরানের নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় ও প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের মিত্র দেশগুলোর সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য রুট সচল রাখার অজুহাতে ইরাক, সিরিয়া ও উপসাগরীয় বিভিন্ন রাষ্ট্রে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি ও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন রেখেছে। অন্যদিকে, ইরান এই মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও আধিপত্যকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য সরাসরি বড় ধরনের হুমকি বলে মনে করে। এর ফলে সিরিয়া বা ইরাকের মরুভূমিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ছাউনি, লজিস্টিক হাব এবং লোহিত সাগরে চলাচলকারী পশ্চিমা বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে প্রায়ই সুনির্দিষ্ট ড্রোন ও রকেট হামলা চালায় ইরান সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠী।
এই আক্রমণগুলোর জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও হাত গুটিয়ে বসে নেই। মার্কিন সেন্টকম প্রায়ই সিরিয়া ও ইরাকে অবস্থিত এসব ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীর অস্ত্রাগার, কমান্ড সেন্টার ও আস্তানা লক্ষ্য করে আকস্মিক বিমান হামলা ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা করে। দুই পক্ষের এই ধারাবাহিক হামলা-পাল্টাহামলার সংস্কৃতি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত এক ভঙ্গুর অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে। একদিকে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং অন্যদিকে ইরানের কৌশলগত ধৈর্য ও আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জেদ, এই দুয়ে মিলে যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় আকারের অনাকাক্সিক্ষত আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা টিকিয়ে রেখেছে। তা ছাড়া এই উত্তেজনার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্য, জ্বালানি তেল সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক সংকটের চক্রে আটকে রেখেছে।
ইসরায়েল-লেবানন
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত বরাবর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং দেশটির শক্তিশালী সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম তীব্র ও ধ্বংসাত্মক সীমান্তযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। যদিও এটি কাগজে-কলমে লেবানন সরকারের সরাসরি কোনো রাষ্ট্রীয় সামরিক অভিযান নয়, কিন্তু লেবাননের সার্বভৌম ভূখণ্ডের একটি বিশাল অংশ ব্যবহার করে হিজবুল্লাহর কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ এবং ইসরায়েলি ভূখণ্ডে তাদের ধারাবাহিক রকেট আক্রমণের কারণে এটি স্পষ্টতই দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার একটি গুরুতর আন্তর্জাতিক ও আন্তঃসীমান্ত সংঘাতে পরিণত হয়েছে। ২০০৬ সালের যুদ্ধের পর জাতিসংঘের নির্ধারিত ‘ব্লু লাইন’ বা সীমানা রেখা বরাবর প্রতিদিনের এই বিমান হামলা, তীব্র গোলাবর্ষণ ও ড্রোন আক্রমণ পুরো সীমান্ত অঞ্চলকে এক অবরুদ্ধ রণক্ষেত্রে পরিণত করে রেখেছে।
এই সংঘাতের পেছনের মূল অনুঘটক হলো দুই পক্ষের মধ্যকার গভীর সামরিক বৈরিতা ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তসংলগ্ন শহরগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং হিজবুল্লাহর হামলার ভয়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া হাজার হাজার ইসরায়েলি নাগরিককে পুনরায় সেখানে পুনর্বাসিত করার লক্ষ্যে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (ওউঋ) দক্ষিণ লেবাননে নিয়মিত সুনির্দিষ্ট আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলের মূল সামরিক লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহর দূরপাল্লার রকেটভাণ্ডার ধ্বংস করা, তাদের কমান্ড স্ট্রাকচার দুর্বল করা এবং তাদের যোদ্ধাদের লিটানি নদীর উত্তরাঞ্চলে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করা। এর বিপরীতে, নিজেদের সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থান টিকিয়ে রাখতে হিজবুল্লাহও নিয়মিত ইসরায়েলের ভেতরের বিভিন্ন বিমানঘাঁটি, সামরিক নজরদারি কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, নির্দেশিত গাইডেড রকেট এবং আত্মঘাতী ড্রোন ছোড়া অব্যাহত রেখেছে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি এবং বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর বারবার যুদ্ধবিরতির চেষ্টা সত্ত্বেও এই সীমান্ত সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই। এই দুই শক্তির রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বে দক্ষিণ লেবাননের অসংখ্য ছোট-বড় গ্রাম ও জনপদ আজ প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার সাধারণ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। লেবাননের ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে এই সংঘাত দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সীমান্ত সংঘাতের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়া যেকোনো মুহূর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ ও রক্তক্ষয়ী ইসরায়েল-লেবানন সর্বাত্মক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে, যা সাময়িকভাবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেবে।
ইসরায়েল-সিরিয়া
সিরিয়ায় ২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার সুযোগে দেশটি বর্তমানে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির এক রক্তক্ষয়ী মারণাস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্র এবং প্রক্সি যুদ্ধের প্রধান থিয়েটারে পরিণত হয়েছে। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল নিয়মিতভাবে সিরিয়ার আকাশসীমা এবং সার্বভৌম ভূখণ্ড লঙ্ঘন করে সুনির্দিষ্ট বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনা করে আসছে। কাগজে-কলমে এটি ইসরায়েল ও সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর মধ্যকার সরাসরি কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ না হলেও সিরীয় ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে অবস্থানরত বিদেশি মিলিশিয়া ও তেহরানপন্থি শক্তিগুলোর কারণে এটি একটি গুরুতর ও নিয়মিত আন্তর্দেশীয় সংঘাতে রূপ নিয়েছে। দামেস্ক এবং আলেপ্পোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোসহ সিরিয়ার বিভিন্ন কৌশলগত সামরিক ঘাঁটিতে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত খবরে পরিণত হয়েছে।
এই ধারাবাহিক হামলার পেছনে ইসরায়েলের একটি অত্যন্ত কড়া ও সুনির্দিষ্ট সামরিক ও কৌশলগত নীতি কাজ করছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, সিরিয়ার অস্থিতিশীল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সুযোগ নিয়ে ইরান এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ বাহিনী দেশটির ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইসরায়েলবিরোধী একটি স্থায়ী দ্বিতীয় ফ্রন্ট বা যুদ্ধের মোর্চা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে, ইরান থেকে সিরিয়ার ভেতর দিয়ে লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র, ড্রোন এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের যে গোপন রুট বা ‘ল্যান্ড করিডর’ রয়েছে, তা যেকোনো মূল্যে ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। এর ফলে দামেস্কের উপকণ্ঠ কিংবা সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মরুভূমিতে যখনই কোনো সামরিক ট্রানজিট বা অস্ত্রভাণ্ডারের সন্ধান পাওয়া যায়, ইসরায়েল তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে বিমান হামলা চালিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেয়।
সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকার এবং তাদের প্রধান সামরিক মিত্র রাশিয়া ও ইরান এই আন্তর্দেশীয় হামলাগুলোর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। সিরীয় সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে, এই ধরনের বিমান হামলা তাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট অবমাননা। মাঝে মাঝে সিরিয়ার সোভিয়েত আমলের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা এস-সিরিজের ডিফেন্স সিস্টেম দিয়ে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানকে প্রতিহত করার ব্যর্থ বা সীমিত প্রচেষ্টা চালানো হলেও ইসরায়েলের অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও স্টিলথ জেটের সামনে তা খুব একটা টিকতে পারে না। ফলে সিরিয়ার সাধারণ মানুষ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি এই পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রতিনিয়ত পেষিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনীতিতে এই সংঘাত এক স্থায়ী উত্তেজনার আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে, যা সিরিয়ার পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার সব পথকে অবরুদ্ধ করে দিয়েছে।
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী-সৌদি আরব
ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুথি) বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং প্রতিবেশী সৌদি আরবের মধ্যকার সামরিক বৈরিতা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্দেশীয় সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সরাসরি হস্তক্ষেপের পর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সীমানার মধ্যে আটকে থাকেনি। ইয়েমেনের একটি বিশাল অংশ ও রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণকারী হুথিরা নিয়মিত সীমান্ত অতিক্রম করে সৌদি আরবের ভূখণ্ডে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার চালকবিহীন ড্রোন ছোড়ার মাধ্যমে এই সংঘাতকে একটি আন্তর্জাতিক প্রচ্ছন্ন যুদ্ধের রূপ দিয়েছে। এর পাশাপাশি লোহিত সাগরের কৌশলগত বাণিজ্যিক জলপথে হুথিদের ধারাবাহিক সামরিক তৎপরতা এই আঞ্চলিক সংকটকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বড় হুমকিতে পরিণত করেছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মূলে রয়েছে আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং নিরাপত্তার চরম সংকট। সৌদি আরব ইয়েমেনে তাদের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তে একটি সুন্নিবান্ধব ও অনুগত সরকার বজায় রাখতে চায় এবং তাদের মতে ইয়েমেনের মাটিতে শিয়া মতাবলম্বী হুথিদের শক্ত অবস্থান ও ইরানের সামরিক প্রভাব তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। এই শঙ্কা থেকে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং কঠোর সামরিক অবরোধ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, নিজেদের সামরিক সক্ষমতা জাহির করতে এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে হুথি গোষ্ঠী একাধিকবার সৌদি আরবের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো ও সামরিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্ত অঞ্চল, বিভিন্ন বিমানবন্দর এবং অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি আরামকোর তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা তাদের অন্যতম প্রধান যুদ্ধকৌশল হয়ে উঠেছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওমানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতির বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবু এই অঞ্চলের শান্তি প্রক্রিয়া অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। সম্প্রতি লোহিত সাগর, বাব-এল-মানদেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্বব্যাপী নৌ-পরিবহন ব্যবস্থাকে অচল করে তুলেছে। এর জবাবে মার্কিন ও পশ্চিমা জোটের বিমান হামলার পাশাপাশি সৌদি আরবের আকাশসীমা সুরক্ষায় ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট ডিফেন্স সিস্টেম দিয়ে হুথিদের আক্রমণ প্রতিহত করার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। সব মিলিয়ে, কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং প্রক্সি যুদ্ধের রাজনীতির কারণে ইয়েমেন-সৌদি সীমান্ত আজও এক বিপজ্জনক উত্তেজনার হটস্পট হিসেবে রয়ে গেছে।
পাকিস্তান-আফগানিস্তান
দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক গভীর সামরিক বৈরিতা ও আন্তঃসীমান্ত সংঘাতে রূপ নিয়েছে। এই উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুই দেশের মধ্যকার প্রায় দুই হাজার ৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিতর্কিত ঔপনিবেশিক সীমান্ত, যা ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবেই এই সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আস্থার অভাব ছিল, তবে ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এই সংঘাত নতুন ও অত্যন্ত তীব্র মোড় নিয়েছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি, রকেট নিক্ষেপ এবং বিমান হামলার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রধান কারণ হলো আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ এবং নিরাপত্তা নিয়ে পাকিস্তানের গভীর উদ্বেগ। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগানিস্তানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী তাদের ভূখণ্ডে নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (ঞঞচ) নিরাপদ আশ্রয় ও উর্বর ভূমি দিয়ে আসছে। এই টিটিপি জঙ্গিরা প্রায়ই আফগান সীমান্ত থেকে সুড়ঙ্গ বা গোপন রুট ব্যবহার করে পাকিস্তানের ভেতরে প্রবেশ করে দেশটির সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে রক্তক্ষয়ী হামলা চালায়। এই পরিস্থিতির জবাব দিতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী একাধিকবার আফগান ভূখণ্ডের ভেতরে প্রবেশ করে সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা ও সার্জিক্যাল স্ট্রাইক পরিচালনা করেছে। অন্যদিকে, আফগান তালেবান সরকার এই ধরনের বিমান হামলাকে তাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন বলে দাবি করে এবং এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
সীমান্ত লঙ্ঘন এবং বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় প্রায়ই আফগান সীমান্তরক্ষী বাহিনী ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানি সামরিক পোস্টগুলোর ওপর ভারী আর্টিলারি ও মরটার শেল দিয়ে হামলা চালায়, যার ফলে উভয় পক্ষেই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এই রক্তক্ষয়ী সীমান্ত সংঘর্ষের কারণে দুই দেশের মধ্যকার প্রধান বাণিজ্যিক রুটগুলো ও সীমান্ত গেট প্রায়ই দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে, যা দুই দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও বেশি পর্যুদস্ত করছে। এছাড়া, মিলিয়ন মিলিয়ন আফগান শরণার্থীর বোঝা এবং কূটনৈতিক চ্যানেলে চরম অবিশ্বাসের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক স্থায়ী ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
ইরান-উপসাগরীয় সামুদ্রিক লক্ষ্যবস্তু
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বহনের ক্ষেত্রে পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের সংযোগস্থলগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চোকপয়েন্ট বা সংকীর্ণ জলপথ। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি এবং বাব-এল-মানদেব প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল ও পণ্যবাহী জাহাজের একটি বিশাল অংশ চলাচল করে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই সামুদ্রিক অঞ্চলগুলো কেবল জলপথ নয়, বরং এক তীব্র আন্তর্দেশীয় সংঘাত ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তাদের মিত্র বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও লোহিত সাগর তীরবর্তী মিলিশিয়ারা এই আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের ওপর একের পর এক হামলা চালিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
এই সামুদ্রিক উত্তেজনার পেছনের মূল ভূ-রাজনৈতিক কারণ হলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক আধিপত্য এবং কৌশলগত জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জবাবে ইরান প্রায়ই পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক ট্যাংকারগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে কড়া বার্তা দেয় এবং অতীতে বেশ কয়েকটি বিদেশি তেলবাহী জাহাজ তাদের জলসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক করেছিল। এর পাশাপাশি, লোহিত সাগর এবং ওমান উপসাগরে চলাচলকারী ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা দেশগুলোর পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান সমর্থিত হুথি ও অন্য মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো অত্যাধুনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, আত্মঘাতী সামুদ্রিক ড্রোন এবং দূরপাল্লার রকেট দিয়ে নিয়মিত আক্রমণ চালিয়ে আসছে।
এই সামুদ্রিক সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশ্বের বড় বড় শিপিং বা মালবাহী কোম্পানিগুলো নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সুয়েজ খালের পথ এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহন খরচ এবং সময় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এই হুমকি মোকাবিলা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিত্ররা লোহিত সাগরে ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’-এর মতো যৌথ নৌ-অভিযান ও সামরিক টহল পরিচালনা করছে। তা ছাড়া এই জলপথগুলোতে যেকোনো বড় ধরনের ভুল হিসাব বা সামরিক সংঘর্ষ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক সর্বগ্রাসী আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার স্থায়ী আশঙ্কা তৈরি করে রেখেছে।
কঙ্গো প্রজাতন্ত্র-রুয়ান্ডা
মধ্য আফ্রিকার বৃহৎ রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআরসি) সমৃদ্ধ কিন্তু অস্থিতিশীল পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরে এক অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী ও জটিল আঞ্চলিক সংঘাতের মুখোমুখি। এই সংঘাতটি মূলত কঙ্গো সরকারের সামরিক বাহিনী এবং বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘এম২৩’-এর মধ্যকার লড়াই দিয়ে শুরু হলেও এটি এখন কঙ্গো এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র রুয়ান্ডার মধ্যকার এক তীব্র আন্তর্দেশীয় সামরিক বৈরিতায় রূপ নিয়েছে। উত্তর কিভু ও দক্ষিণ কিভু প্রদেশের কৌশলগত খনিজসমৃদ্ধ এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং জাতিগত নিরাপত্তা সংকটকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই অস্থিরতা আফ্রিকার মহান হ্রদ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
এই সংঘাতের পেছনের প্রধান আন্তর্দেশীয় কারণ হলো পারস্পরিক গুরুতর অভিযোগ ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত। কঙ্গো সরকার এবং জাতিসংঘ স্থায়ীভাবে অভিযোগ করে আসছে যে, রুয়ান্ডা সরকার কঙ্গোর ভূখণ্ডে সক্রিয় এম২৩ বিদ্রোহীদের বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, অর্থ ও নিজস্ব সেনা পাঠিয়ে সহায়তা করছে। রুয়ান্ডার লক্ষ্য মূলত কঙ্গোর বিপুল পরিমাণ দুর্লভ খনিজ সম্পদ (যেমনÑ কোল্টান ও স্বর্ণ) অবৈধভাবে আহরণ করা এবং নিজেদের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এর বিপরীতে রুয়ান্ডা সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করে যে, কঙ্গো সরকার তাদের ভূখণ্ডে অবস্থানরত ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার পেছনে দায়ী চিহ্নিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এফডিএলআরকে আশ্রয় ও সামরিক সমর্থন দিচ্ছে, যা রুয়ান্ডার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি চরম হুমকি।
দুই দেশের এই পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সামরিক উত্তেজনার ফলে কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে এক অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলো থেকে লাখ লাখ নিরীহ কঙ্গোলিজ নাগরিক নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবিক সংকটের মুখে পড়েছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী এবং পূর্ব আফ্রিকান আঞ্চলিক সামরিক জোটের উপস্থিতি সত্ত্বেও সীমান্ত এলাকায় প্রায়ই দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি ও ভারী অস্ত্রের বোমাবর্ষণের ঘটনা ঘটে। আফ্রিকার আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক আলোচনার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুই দেশের মধ্যকার চরম সামরিক অবিশ্বাস এবং সীমান্তে প্রক্সি গোষ্ঠীর তৎপরতার কারণে এই সংঘাত এখন মধ্য আফ্রিকার নিরাপত্তার জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী বারুদস্তূপে পরিণত হয়ে রয়েছে।
