আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দ কমানো ও ব্যয় সংকোচন নীতির প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে আর্জেন্টিনা। প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সরকারের শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজধানী বুয়েনস এইরেসে রাজপথে নেমেছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা। বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আটক হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েকজন, যাঁদের মধ্যে নিরাপত্তাকর্মীরাও রয়েছেন।
বিক্ষোভের অংশ হিসেবে বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান অনুষদের একটি ভবন এক দিনের জন্য দখলে নেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে ব্যানার টানিয়ে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দেন তাঁরা। তাঁদের স্লোগানের মধ্যে ছিল, ‘এভাবে আর চলতে পারে না।’
শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে বিনা মূল্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো, বেতন ও বৃত্তির অর্থের সংকট এবং গবেষণার সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী এমিলিয়ানো গাতো বলেন, বেতন দিয়ে মৌলিক চাহিদা মেটাতে না পারায় অনেক মেধাবী অধ্যাপক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাচ্ছেন। তিনি নিজেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা করতে চান। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ব্যয় সংকোচনের কঠোর নীতি অনুসরণ করছেন প্রেসিডেন্ট মিলেই। তাঁর সরকার সরকারি খাতে বিপুলসংখ্যক কর্মী ছাঁটাই, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বন্ধ এবং ভর্তুকি ও সরকারি কর্মসূচির বরাদ্দ কমানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরছে। তবে শিক্ষা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণ ও পেনশনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধিতা বাড়ছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরে মিলেই দাবি করেন, টানা ২৭ মাস ধরে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে এবং অর্থনীতি ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় চার গুণ গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, অর্থনৈতিক অগ্রগতির দাবি করা হলেও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ওপর ব্যয় সংকোচনের চাপ বাড়ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন বাড়ানোর দাবিতে গত বছর আর্জেন্টিনার কংগ্রেসে একটি আইন পাস হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের আইনও অনুমোদন করা হয়। প্রেসিডেন্ট মিলেই এসব আইনে ভেটো দিলেও পরে কংগ্রেস তাঁর ভেটো অগ্রাহ্য করে আইনগুলো পুনরায় অনুমোদন করে।
তবে অর্থের সংস্থান নির্দিষ্ট করা হয়নি—এমন যুক্তিতে সরকার আইনগুলোর বাস্তবায়ন আটকে রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবি, বেতন ও বৃত্তির অর্থ পুনর্বহাল, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজেট হালনাগাদ এবং গবেষণা, হাসপাতাল ও অবকাঠামোর জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
এসব দাবির কিছু অংশ বাস্তবায়ন না করায় একটি ফেডারেল আদালত সরকারকে প্রতিদিন এক লাখ পেসো জরিমানা করেছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ওই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭০ মার্কিন ডলার।
বৃহস্পতিবার বুয়েনস এইরেসে আইন বাস্তবায়ন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন বাড়ানোর দাবিতে বড় বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভকারীরা সাধারণ ধর্মঘটেরও আহ্বান জানান। এতে রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
একপর্যায়ে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়েন। এ সময় অন্তত ২৫ জনকে আটক করা হয়। সংঘর্ষে নিরাপত্তাকর্মীসহ কয়েকজন আহত হন।
রসায়নের অধ্যাপক মারিয়া তেরেসা দে হেসুস বলেন, মাসে প্রায় ৭০০ ডলার আয় করেও তাঁর পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিবাদে নামা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, শিক্ষকতা ও গবেষণা তাঁর ভালো লাগে। কিন্তু এ জন্য তাঁকে রাস্তায় নামতে হবে, এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়। তাঁর মতে, দেশের ভবিষ্যতের জন্য সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকার বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না।
তবে মিলেইয়ের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রতি আর্জেন্টিনার একাংশের সমর্থন রয়েছে। তাঁদের আশা, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বেতন বাড়বে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।
অন্যদিকে, সমালোচকদের অভিযোগ, সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে সমাজের প্রভাবশালী ও সচ্ছল অংশ বেশি সুবিধা পাচ্ছে। বিপরীতে, ব্যয় সংকোচনের বোঝা বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও সরকারি ব্যয় নিয়ে এই বিরোধ আর্জেন্টিনায় সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিকে ঘিরে চলমান বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
সূত্র: আল জাজিরা
