লালনের দর্শনে মানবতা ও আত্মপরিচয়ের শিক্ষা, টিএসসিতে আলোচনা সভা
নিজস্ব প্রতিবেদক
সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে একটি জাতির স্বকীয়তা দুর্বল করার চেষ্টা করা হয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, এ ধরনের আগ্রাসন মোকাবিলায় দেশের তরুণদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চর্চা ও বিকাশই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চেতনাকে শক্তিশালী করতে পারে।
শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) পায়রা চত্বরে মরমি সাধক ফকির লালন শাহর ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘কালচার ফর ইউনিটি বাংলাদেশ’ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক কাজী জেসিন এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসির অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, বাংলাদেশের ওপর বিভিন্নভাবে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রচেষ্টা চলতে পারে। তবে নিজস্ব সংস্কৃতির গভীরতা অনুধাবন, চর্চা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়েই এ ধরনের প্রচেষ্টা মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিশ্বদরবারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৬-১৭ বছরে দেশকে একমুখী সাংস্কৃতিক ধারায় পরিচালিত করার চেষ্টা হয়েছে। স্বাধীনতার কথা বলা হলেও অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে তরুণ প্রজন্ম এসব বিষয় উপলব্ধি করতে শুরু করেছে বলেও উল্লেখ করেন বিএনপির এই নেতা।
আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, স্বাধীনতার কথা বলা হলেও দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে। বাংলাদেশের সিনেমা হলে ভারতীয় সিনেমা অবাধে প্রদর্শনের উদ্যোগকে তিনি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, একটি জাতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য তার সার্বভৌমত্ব। সেই সার্বভৌমত্ব দুর্বল করার যেকোনো প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার যে বিকাশ ঘটেছে, তার প্রকাশ দেখা গেছে জুলাই আন্দোলনে। নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে জেগে উঠলে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অমানবিক শাসনের পতন ঘটে।
বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও দর্শনের গুরুত্ব তুলে ধরে রিজভী বলেন, লালন শাহ ও মুকুন্দরামসহ বাংলার লোককবিদের চিন্তায় মানবতাবাদী দর্শনের প্রকাশ ঘটেছে। তাঁদের সৃষ্টিতে সহজ ভাষায় মানুষের মর্যাদা, আত্মপরিচয় ও মানবিকতার কথা উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সংগীতেও এই ধারার প্রভাব লক্ষ করা যায়।
তিনি আরও বলেন, লালনের গান ও বাউল সুর বাংলা সাহিত্য ও সংগীতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতেও বাউল সুরের প্রভাব রয়েছে। তাই জাতীয় চেতনা বিকাশে মানবতাবাদী দর্শন, লোকজ ঐতিহ্য এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক চর্চাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আলোচনা সভায় বক্তারা লালন শাহর জীবনদর্শন, মানবতাবাদী চিন্তা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

