যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ব্যবসায়ী আবদুল মালেকের ছেলে শিহাব উদ্দিন মালেক সাগরকে ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে হত্যার অভিযোগ তুলে প্রধান আসামি মাহজাবিন ইসলাম রিয়াকে গ্রেপ্তার, পিবিআইয়ে মামলার তদন্ত হস্তান্তর ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছে পরিবার।
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ব্যবসায়ী আবদুল মালেকের ছেলে শিহাব উদ্দিন মালেক সাগরকে (৩৬) পরিকল্পিতভাবে ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তার পরিবার। এ ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি মাহজাবিন ইসলাম রিয়াকে গ্রেপ্তার, মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) হস্তান্তর এবং সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছে তারা।
রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান নিহতের স্বজনেরা।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নিহতের ভাই সাইফুদ্দিন মালেক। তিনি বলেন, সাগরকে পরিকল্পিতভাবে ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে হত্যা করা হয়েছে। পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ আগস্ট রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে সাগরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর পাঁচ দিন পর, ২৫ আগস্ট পরিবারের সদস্যরা ভাটারা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার নম্বর ৪৪।
নিহতের পরিবার জানায়, সাগরের পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে। ২০১৮ সালে তিনি চট্টগ্রামে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ঢাকায় গাড়ির ব্যবসা শুরু করেন। ঢাকায় অবস্থানকালে মাহজাবিন ইসলাম রিয়ার সঙ্গে তার পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে পরিবারের দাবি।
পরিবারের ভাষ্য, সম্পর্কের একপর্যায়ে সাগর বিয়ের প্রস্তাব দিলেও রিয়া তাতে সম্মতি দেননি। পরে তাদের সম্পর্কের অবনতি হলে সাগর চট্টগ্রামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পরিবারের দাবি, চট্টগ্রামে অবস্থানকালে গত ১৯ আগস্ট রিয়ার আমন্ত্রণে সাগর ঢাকায় আসেন। ২০ আগস্ট ছিল তার জন্মদিন। ওই দিনই ভাটারা এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে, ২১ আগস্ট চট্টগ্রামে ফেরার জন্য বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটের ফ্লাইটের রিটার্ন টিকিট কিনেছিলেন সাগর বলে জানিয়েছে পরিবার।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের সদস্যরা আরও দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মামলার প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত রিয়াকে সাগরকে বটি হাতে হত্যার হুমকি দিতে দেখা যায়। এ ছাড়া পুলিশের বরাত দিয়ে তারা জানান, সাগরের লাশ উদ্ধারের সময় অ্যাপার্টমেন্টের কেয়ারটেকার মুসা ও এক অজ্ঞাত নারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
পরিবারের অভিযোগ, সাগরের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে অসংগতি রয়েছে। ঘটনার সময় অ্যাপার্টমেন্টে কারা উপস্থিত ছিলেন, মৃত্যুর আগে ও পরে কারা সাগরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং ঘটনাস্থলের আলামত—এসব বিষয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, মামলার প্রধান আসামি হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন। এতে তারা উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, তদন্ত চলাকালে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট করা বা তদন্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে। এ কারণে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের সদস্যরা সাগরের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত, ফরেনসিক ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন যাচাই এবং ঘটনার আগে ও পরে ফোনকল, বার্তা ও অন্যান্য যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণের দাবি জানান। একই সঙ্গে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান তারা।
গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করে পরিবারের সদস্যরা বলেন, সাগরের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন নিহতের চাচা আনোয়ার হোসেন সিপিএ। তিনি বলেন, এটি সাধারণ আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যা পরবর্তী সময়ে আত্মহত্যা হিসেবে চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘটনার সময় ঘরে উপস্থিত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সাগরের শেষ মুহূর্তের যোগাযোগসূত্রগুলো খতিয়ে দেখার জোর দাবি জানান তিনি।
এ ছাড়া অনলাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অ্যাটর্নি মি. রেমন্ড আব এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের সাবেক এজেন্ট মি. মাইকেল ডোনোহো সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে নিহতের বাবা আবদুল মালেক, ভাই শামীম মালেক ও সালাউদ্দিন মালেকসহ পরিবারের স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন।
