টরন্টোর আকাশে একের পর এক মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে কাচে মোড়া সুউচ্চ আবাসিক ভবন। একসময় এসব ভবনের একটি কন্ডোমিনিয়াম বা কন্ডো কেনার জন্য ক্রেতাদের রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নামতে হতো। নির্মাণকাজ শুরুর আগেই বিক্রি হয়ে যেত অনেক ফ্ল্যাট। বিনিয়োগকারীরা আগাম বুকিং দিয়ে রাখতেন, কারণ তাঁদের বিশ্বাস ছিল, কয়েক বছর পর সেই ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে কয়েক গুণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। যে টরন্টোয় একসময় কন্ডো কেনার জন্য ক্রেতাদের লাইন পড়ত, সেখানে এখন হাজার হাজার নতুন ফ্ল্যাট অবিক্রীত পড়ে আছে। নির্মাতারা ক্রেতা খুঁজছেন, বিনিয়োগকারীরা হিসাব কষছেন, আর সাধারণ মানুষের সামনে খুলে যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম দামে বাড়ি কেনার নতুন সম্ভাবনা।
টরন্টো ও আশপাশের এলাকায় আবাসন খাতের এই পরিবর্তনের মধ্যে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য নতুন এক সুযোগ তৈরি হয়েছে। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলো এতদিন অবিক্রীত কন্ডো বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিশেষ ছাড়ে বিক্রি করত। সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে এসব বিশেষ মূল্যে কন্ডো কেনার সুযোগ ছিল সীমিত। এবার QuietMarket নামে একটি নতুন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ক্রেতারাও সেই সুবিধা পাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের মাধ্যমে নির্বাচিত কন্ডোতে প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপিত মূল্যের তুলনায় গড়ে ৪৫ শতাংশ ছাড়ের সুযোগ রয়েছে।
টরন্টোর কন্ডো বাজারে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, তা বুঝতে হলে কয়েক বছর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প সুদের ঋণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাসনের ক্রমবর্ধমান চাহিদায় চাঙা ছিল রিয়েল এস্টেট বাজার। কিন্তু সুদের হার বৃদ্ধি, ঋণ পাওয়ার শর্ত কঠিন হওয়া এবং ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। অনেক ক্রেতা এখন প্রয়োজনীয় মর্টগেজ পাচ্ছেন না। আবার বহু কন্ডোর বর্তমান বাজারমূল্য চুক্তির সময় নির্ধারিত দামের নিচে নেমে এসেছে। ফলে কেউ কেউ ক্রয়চুক্তি সম্পন্ন করতে পারছেন না। এতে নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের হাতে ফিরে আসছে আগে বিক্রি হওয়া ফ্ল্যাট।
নতুন কন্ডোর বাজারে সংকট কতটা গভীর, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় আবাসন বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান Urbanation-এর পরিসংখ্যানে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাস শেষে বৃহত্তর টরন্টো ও হ্যামিল্টন এলাকায় নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও অবিক্রীত ছিল ৪ হাজার ২৯৫টি নতুন কন্ডো। এক বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। দুই বছর আগের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ। অন্যদিকে নির্মাণাধীন আরও হাজার হাজার কন্ডো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাজারে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।
বিপুলসংখ্যক অবিক্রীত কন্ডো নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। ভবন নির্মাণ শেষ হলেও ব্যাংকঋণ, সুদ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বন্ধ হয় না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে দাম না কমিয়ে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি কন্ডো বিশেষ ছাড়ে বিক্রির পথ বেছে নিচ্ছে। বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একবারে ১০টি, ২০টি কিংবা তারও বেশি কন্ডো কিনে সাধারণ ক্রেতাদের তুলনায় কম দাম পাওয়ার সুযোগ নিচ্ছে। এতে নির্মাতারাও এক লেনদেনে একাধিক ফ্ল্যাট বিক্রি করে নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে পারছেন।
এমন পরিস্থিতিতে QuietMarket-এর আবির্ভাব টরন্টোর আবাসন বাজারে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য হলো, বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ মূল্যে সাধারণ ক্রেতাদেরও নতুন কন্ডো কেনার সুযোগ করে দেওয়া। এর ফলে একজন ক্রেতাকে আর একসঙ্গে দশটি ফ্ল্যাট কিনতে হবে না। নিজের বসবাসের জন্য একটি ফ্ল্যাট কিনেও তিনি নির্বাচিত কিছু প্রকল্পে প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের মতো মূল্যছাড়ের সুযোগ পেতে পারেন।
QuietMarket প্রতিষ্ঠা করেছেন আবাসন খাতে অভিজ্ঞ কয়েকজন উদ্যোক্তা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তারা এমন সব কন্ডোর তথ্য সংগ্রহ করে, যেগুলো সাধারণ রিয়েল এস্টেট ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় না। তাদের পর্যালোচনা করা সম্পত্তির আট শতাংশেরও কম শেষ পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মে স্থান পায়। অর্থাৎ বাজারের সব অবিক্রীত কন্ডো তালিকাভুক্ত না করে বিশেষ ছাড়ের সুযোগ রয়েছে এমন কিছু সম্পত্তি বেছে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
সাধারণ ক্রেতাদের জন্য প্রক্রিয়াটিও তুলনামূলক সহজ। QuietMarket-এর ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রথমে চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। কোন এলাকায় বাড়ি কিনতে চান, কতটি শয়নকক্ষ প্রয়োজন, বাজেট কত এবং কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ক্রেতার চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে সম্ভাব্য কন্ডোর তালিকা তৈরি করা হয়। প্রাথমিকভাবে মূল্য, ছাড়ের পরিমাণ এবং এলাকার তথ্য দেখা যায়। তবে নির্দিষ্ট প্রকল্পের নাম, নির্মাতার পরিচয় ও সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানতে পরিচয় যাচাই এবং গোপনীয়তা রক্ষার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এই সেবা ব্যবহার করতে ক্রেতাদের কোনো ফি দিতে হয় না।
QuietMarket-এর কার্যক্রম এখন টরন্টো ও বৃহত্তর টরন্টোর ২২টির বেশি স্থানীয় বাজারে বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে মিডটাউন, ইটোবিকোক, ইয়র্কভিল, মিসিসাগা, ব্র্যাম্পটন, ভন ও ডারহামের মতো এলাকা।
তবে ৪৫ শতাংশ ছাড়ের বিষয়টি নিয়ে ক্রেতাদের বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ ছাড় হিসাব করা হচ্ছে প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপিত মূল্যের ভিত্তিতে। সেই বিজ্ঞাপিত মূল্য যদি বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি হয়, তাহলে বড় অঙ্কের ছাড় পাওয়ার পরও সম্পত্তিটি প্রকৃত অর্থে সস্তা নাও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি কন্ডোর বিজ্ঞাপিত মূল্য ১০ লাখ ডলার হলে ৪৫ শতাংশ ছাড়ে সেটি পাওয়া যাবে ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারে। কিন্তু আশপাশে একই ধরনের কন্ডো যদি পাঁচ লাখ ডলারে বিক্রি হয়, তাহলে কথিত বিশেষ ছাড়ের পরও ক্রেতাকে বাজারদরের চেয়ে বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে।
নতুন কন্ডো কেনার আগে মর্টগেজ, সম্পত্তিকর, মাসিক কন্ডো ফি এবং অন্যান্য খরচও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষ করে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ জমা রয়েছে কি না এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের মেরামতের জন্য অতিরিক্ত অর্থ দিতে হতে পারে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্মাণমান ও নির্মাতার পূর্ববর্তী প্রকল্পগুলোর ইতিহাস সম্পর্কে খোঁজ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
QuietMarket নিজেকে রিয়েল এস্টেট ব্রোকারেজ হিসেবে পরিচয় দেয় না। প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম, যা ক্রেতাদের সঙ্গে নির্মাতাদের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে। তাই ক্রয়চুক্তিতে স্বাক্ষর করার আগে স্বাধীন রিয়েল এস্টেট আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক যাচাই সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ছাড়ের মূল্যে কোনো কর রেয়াত অন্তর্ভুক্ত থাকলে ক্রেতা সত্যিই সেই সুবিধার যোগ্য কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে।
QuietMarket-এর এই উদ্যোগ সাধারণ ক্রেতাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে প্রথমবার বাড়ি কিনতে আগ্রহী তরুণ পরিবার, নতুন অভিবাসী এবং দীর্ঘদিন ধরে ভাড়াবাড়িতে বসবাসকারী মানুষের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। টরন্টো ও আশপাশের এলাকায় বাড়ির উচ্চমূল্য বহু পরিবারকে নিজেদের একটি স্থায়ী ঠিকানা গড়ার স্বপ্ন থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। এখন নির্বাচিত কিছু কন্ডোতে বড় ছাড়ের সুযোগ সেই স্বপ্ন পূরণের পথকে আরও সহজ করে তুলতে পারে।
টরন্টোর কন্ডো বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নির্মাণপ্রতিষ্ঠান ও পুরোনো বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের হলেও নতুন ক্রেতাদের জন্য নিয়ে এসেছে সুবর্ণ সুযোগ। বাজার আরও কতটা পরিবর্তিত হবে কিংবা বর্তমান মূল্যই সর্বনিম্ন কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে একসময় যে বিশেষ ছাড়ের সুযোগ বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন সাধারণ ক্রেতাদের নাগালে আসতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে নিজের একটি বাড়ির স্বপ্ন দেখা মানুষের জন্য এটি নিঃসন্দেহে আশার খবর।
তথ্যসূত্র: Toronto Star; QuietMarket
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::টরন্টোয় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ে কন্ডো কেনার নতুন সুযোগ first appeared on DesheBideshe.