জীববৈচিত্র্যের ক্রমাগত ক্ষতি কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। মানবসৃষ্ট নানা কর্মকাণ্ডে এ বিপর্যয়ের পরিধি নিয়ে ইতোমধ্যেই সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। এর পাশাপাশি অনাগত ক্ষতি বন্ধে ‘প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস।
এমন প্রেক্ষাপটে পৃথিবীকে রক্ষায় দেশগুলোর জরুরি পদক্ষেপের ওপর আগামীর সমৃদ্ধি নির্ভর করছে। তাই ঘটে যাওয়া বিপর্যয় কাটিয়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ-১৭ শুরু হয়েছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) এ সম্মেলনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন

এ সম্মেলনের লক্ষ্য হচ্ছে- জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা এবং চার বছর আগে গৃহীত কুনমিং–মন্ট্রিল বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামো বাস্তবায়নে আরও অগ্রসর হওয়া।
কপ-১৭ (COP17) কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আর্মেনিয়ার ইয়েরেভেনের এই সম্মেলন কপ-১৭ (COP17) নামেই বেশি পরিচিত। এটি জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের পক্ষগুলোর ১৭তম সম্মেলন।
বিজ্ঞাপন
জাতিসংঘে আর্মেনিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি পারুইর হোভহান্নিসিয়ান বলেন, এই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তবে পরিমাপযোগ্য অগ্রগতিতে রূপান্তর করা।

তিনি বলেন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন-এমন একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিতে চায় কপ-১৭।
কপ-১৭ সম্মেলন: আলোচনার টেবিলে যা যা থাকছে
বিজ্ঞাপন
অগ্রগতি পর্যালোচনা: কুনমিং–মন্ট্রিল কাঠামোর আওতায় প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক পর্যায়ে সম্মিলিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। দেশগুলো তাদের জাতীয় প্রতিবেদন এবং হালনাগাদ জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করবে। এতে ২০২২ সালের পর কী অর্জিত হয়েছে এবং কোথায় আরও দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা স্পষ্ট হবে।
বাস্তবায়নের ঘাটতি দূর করা: জাতীয় লক্ষ্য ও পরিকল্পনাকে মাঠপর্যায়ে পরিমাপযোগ্য ফলাফলে কীভাবে রূপান্তর করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে।
বিজ্ঞাপন
অর্থায়ন নিশ্চিত করা: আর্মেনিয়ার জাতিসংঘের রাষ্ট্রদূত হোভহান্নিসিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সব উৎস থেকে বছরে অন্তত ২০০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে অন্তত ৩০ বিলিয়ন ডলার আসার কথা।
ক্যালি ফান্ড কার্যকর করা: কলম্বিয়ার ক্যালিতে কপ-১৬ সম্মেলনে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের আওতায় এই বৈশ্বিক তহবিল গঠনের বিষয়ে সম্মতি হয়েছিল। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জিনগত তথ্য ব্যবহারকারী কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইয়েরেভেনের আলোচনায় তহবিলটি কার্যকর করার বাস্তব পদক্ষেপ এগিয়ে নেওয়া হবে।
অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ: দেশগুলোর অঙ্গীকার বাস্তবে ফল দিচ্ছে কি না তা পরিমাপের জন্য উন্নত পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, তথ্য, সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন: জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পিছিয়ে থাকা ক্ষেত্রগুলোতে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বাইরেও পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে অর্থায়ন, ব্যবসা, টেকসই ভোগ এবং পরিবেশের ক্ষতি করে এমন প্রণোদনা পরিবর্তন।
আদিবাসীদের জ্ঞান-ধারণাকে প্রাধান্য
জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের নির্বাহী সচিব অ্যাস্ট্রিড শোমাকার বলেন, ২০২২ সালে ১৯৬টি দেশ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অঙ্গীকার করেছিল। তবে, একে অপরের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও তাদের জবাবদিহি রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রভাবে কোটি কোটি মানুষ যাদের জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে, তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আগামী দুই সপ্তাহে এখানে কী অগ্রগতি হয় তার ওপর।’
বিজ্ঞাপন
শোমাকার জোর দিয়ে বলেন, প্রকৃতি রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী। এ ক্ষেত্রে আদিবাসী জনগোষ্ঠী, স্থানীয় সম্প্রদায়, নারী ও তরুণদের কাজে লাগানো হয়নি-এমন জ্ঞান, উদ্ভাবনী শক্তি ও ধারণাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে।
জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের অন্যতম লক্ষ্য হলো এর ক্ষতির প্রধান কারণগুলো মোকাবিলা করা। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে ভূমি ও সমুদ্রের ব্যবহার পরিবর্তন, প্রজাতির অনিয়ন্ত্রিত শোষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং বহিরাগত আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার।
বিজ্ঞাপন
‘৩০ বাই ৩০’ কী?
কুনমিং–মন্ট্রিল কাঠামোর সবচেয়ে পরিচিত লক্ষ্যগুলোর একটি হলো ‘৩০ বাই ৩০’। অর্থাৎ, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকার ৩০ শতাংশ সংরক্ষিত করা। ২০৩০ সালেই জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের সময়সীমা শেষ হবে।
শোমাকার বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে দেশগুলোর জাতীয় কর্মপরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। প্রয়োজনের সঙ্গে অর্থায়নের সমন্বয় ঘটাতে হবে এবং ভোগ ও উৎপাদনের ধরনকে পৃথিবীর সীমিত সম্পদের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করতে হবে।
প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান
এর আগে গত সপ্তাহের শুক্রবার ইয়েরেভেনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছিলেন, বিশ্বের ১০ লাখেরও বেশি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
‘প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সম্প্রদায়কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব।
জাতিসংঘের মহাসচিব সতর্ক করে বলেন, বিশ্ব ক্রমেই এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যেখানে পৃথিবী মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠতে পারে।
তবে, তিনি কুনমিং–মন্ট্রিল কাঠামোর আওতায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়া উদ্যোগগুলোর কথাও তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর বিশ্বজুড়ে আরও ১৩ লাখ বর্গকিলোমিটার স্থলভূমি এবং ৬০ লাখ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত এলাকার স্বীকৃতি পেয়েছে।
তারপরও অগ্রগতি সর্বত্র একই রকম নয় এবং অত্যন্ত ধীর বলে সতর্ক করেন গুতেরেস। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের স্থলভাগ ও সমুদ্রের ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের লক্ষ্য অর্জনে দেশগুলো অনেক পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
কেএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
