পাঁচ বছর আগে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে আইনের আশ্রয় নিয়েছিলেন বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী তৃষিয়া নাশতারান। কিন্তু তার অভিযোগ, থানা থেকে আদালত বারবার হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে তাকেই।
সাইবার বুলিংয়ের ঘটনায় প্রকৌশলী ও স্ট্র্যাটেজিস্ট তৃষিয়া নাশতারান জানান, আমার কাছে কিছু অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসতে শুরু করে। ফোনগুলো এসেছিল সেই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে, যার বিরুদ্ধে মামলা করেছি।
তার অভিযোগ, থানা থেকে তার ফোন নম্বর ওই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের দেয়া হয়েছিল, যাতে তারা থানার বাইরে তার সঙ্গে বিষয়টি মিটমাট করে নিতে পারেন।
তিনি আরও জানান, সকালে থানা থেকেও লোকজন তার কাছে আসেন। তারা তাকে বলেন, ‘আপনাকে আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছিল, কিন্তু আপনি হাজির হননি। এখন আমাদের কাছে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এসেছে। আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন আপনাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাই।’
যৌন হয়রানি, অপহরণ, প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলে এই ট্রেন্ড।
সাইবার বুলিংয়ের প্রসঙ্গে কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ‘আমার মনে হয়, যারা সাইবার বুলিং করে, তাদের পেছনে একজন বাস্তব মানুষ থাকে। আবার যাদের নিয়ে সাইবার বুলিং করা হয়, তারাও মানুষ। তাই সবার আবেগ-অনুভূতির জায়গাগুলোকে সম্মান করা উচিত। আমাদের আবেগগতভাবে শক্ত হতে হবে। কারণ, আমরা নারীরা শুধু সাইবার বুলিংয়েরই শিকার হই না। আমার নিজের ক্যাম্পাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও আমি বহিরাগতদের দ্বারা অনেক উত্ত্যক্ত হই। আমার আরও যেসব সিনিয়র আপু আছেন, তারাও উত্ত্যক্ত হন। অথচ এ বিষয়ে আমাদের প্রক্টরিয়াল টিমের কোনো মাথাব্যথা নেই। সেখানে সাইবার বুলিংয়ের বিষয়ে আমি আর কী বলব?’
সাইবার বুলিংয়ের প্রভাব ভুক্তভোগীর পরিবারের ওপরও পড়ে উল্লেখ করে গণমাধ্যমকর্মী জানান, ‘নেতিবাচক মন্তব্য করে আমরা যেসব পোস্ট শেয়ার করি বা মন্তব্য করি, সেগুলো ভুক্তভোগীর পরিবারের ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা নিজেরা লজ্জিত হয়ে পড়েন কিংবা মানুষ নানা কথা বলছে বলে আইনি সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে যান।’
অনলাইনে হয়রানি ও অশালীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে ফেসবুক গ্রুপ ‘নো মোর সাইলেন্স’। গত বছর যাত্রা শুরু করা গ্রুপটির দাবি, সাইবার বুলিংয়ে এ পর্যন্ত দেড় শতাধিক অভিযুক্তের পরিচয় সামনে এনেছে তারা।
এদিকে, নো মোর সাইলেন্সের প্রতিষ্ঠাতা আবির আহমেদ জানান, ‘আমরা প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনের মতো মানুষকে প্রকাশ্যে চিহ্নিত করতে পেরেছি। এই ১০০ থেকে ১৫০ জনের মধ্যে নারীরাও রয়েছেন। আমাদের দেখে নেয়ার হুমকি দেওয়া হয়। আমাদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আপত্তিকর মন্তব্য করারও রেকর্ড রয়েছে। এ ধরনের বেশ কিছু বাধা ও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। অনেকেই পাল্টা প্রতিশোধ নিতে চান। তবে এখন পর্যন্ত সবকিছু মোকাবিলা করেই আমরা এভাবে এগিয়ে যাচ্ছি।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধের বিচার যেমন জরুরি, তেমনি অনলাইনে নৈতিক, মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করাও দরকার।
এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারী অনেক। দেখা যাবে, দেশে কয়েক কোটি মানুষ এসব মাধ্যম ব্যবহার করছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সরকারের পক্ষ থেকে তুলনামূলকভাবে কম উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘সমাজে শুধু ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী বা গবেষক হয়ে উঠলেই হয় না। এসব পেশায় দক্ষ মানুষ তৈরি করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ এবং পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে তোলাও জরুরি।’
সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন বলছে, দেশে অনলাইনে অপরাধের শিকার হওয়া প্রায় ৮০ শতাংশই নারী, যাদের বয়স ১৪ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। কিন্তু লোকলজ্জা ও সচেতনতার অভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ করেন না তাদের বেশিরভাগই।
