ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় এসে প্রথম যে কথাটা শিখলাম, তা হলো-টিয়ার গ্যাসের সঙ্গে কখনো তর্ক করা যায় না। শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুর ১টার একটু পর আমি ‘প্লেস দ্য লা রিপাবলিক’ চত্বরে পৌঁছাই। পরিবেশটা উৎসবমুখরই ছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই পুলিশ রু দ্যু ফুবুর্গ-দু-তেম্পল থেকে চত্বরের দিকে টিয়ার গ্যাসের শেল ছুড়তে শুরু করে।
ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে হলো- আসলে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল কিনা- তা আমি দেখিনি। আমি টিয়ার গ্যাসের সেই ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তা অসম্ভব ছিল। গ্যাস নাকে এসে লাগে, চোখে জ্বালাপোড়া করে ও মুহূর্তের মধ্যে শ্বাস নিতে কষ্ট শুরু হয়। চোখ পিটপিট করতে করতে জ্বালাপোড়া কমাতে আমি ‘বুলভার দ্য মাশা’ রাস্তা দিকে পিছিয়ে গেলাম।
দিনের শুরু থেকেই পুলিশ ভিড়ের ওপর এই কড়া পদ্ধতি বেছে নিয়েছিল, যার ফলে সারা শহরে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে এবং আজকের দিনের বাকি সময়ের পরিস্থিতি কেমন হবে, তার একটা বিশ্রী রূপ ঠিক হয়ে যায়। ১০ম অ্যারোডিসমেন্টের ‘স্ট্রাসবার্গ-সেন্ট-ডেনিস’ এলাকায় পুলিশ যখন তরুণদের এক ভিড়ের ওপর ‘নির্বিচারে’ টিয়ার গ্যাস ছুড়ল, তখন আমার এক বন্ধুকে তার বয়স্ক বাবা-মাকে নিয়ে বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়েছিল।
আমি আবার ‘বুলভার দ্য মাশা’-র দিকে গেলাম। সেখানে বেশ কিছু প্রতিবাদী মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হলো। তাদের মধ্যে সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রও ছিল। সে বলল, সে এসেছে ‘সবার আগে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সমর্থন জানাতে এবং প্রাথমিক স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত- সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশি করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি তুলতে।’ সে আরো জানাল, তাকে রাস্তায় নামার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো ‘১৮ বছরের কম বয়সী ছাত্রদের ওপর পুলিশের অত্যাচার।’ যেমন লস শহরে একটা ঘটনা ঘটেছে, যেখানে পুলিশের গ্রেনেডের আঘাতে এক ১৫ বছরের কিশোরের একটা হাত উড়ে গেছে।
যাদের সঙ্গেই কথা বলেছি, সবাই সমাজের কোনো না কোনো অংশের মানুষ- কেউ তরুণ, কেউ বয়স্ক, কেউ শ্বেতাঙ্গ, আবার কেউ অন্য কোনো জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। ইউনিয়নকর্মী, স্কুলের ছাত্র কিংবা সাধারণ মানুষ- সবাই এসেছিলেন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করতে। পেট্রোলের দাম- যার জন্যই মূলত ২০১৮ সালে হলুদ ভেস্ট আন্দোলন শুরু হয়েছিল- গত মাসের শেষে বেড়ে রেকর্ড প্রতি লিটার ২ দশমিক ৪ ইউরোতে পৌঁছেছে। আর এটাই অনেককে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে।
বিক্ষোভের এই অংশটা একদম শান্তিপূণই ছিল; তারা চত্বর থেকে দূরে মিছিল করছিল, খুব হইচই করছিল এবং পতাকা ওড়ানোর জন্য ছোট মঞ্চে উঠছিল। তবে রাজনৈতিক দাবি জানানো ছাড়া তারা আর কোনো খারাপ কিছু করছিল না। এমন বিক্ষোভে যোগ দিতে পুরো ফ্রান্সজুড়ে সাড়ে পাঁচ লাখ থেকে আট লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল।
বিকেল ৪টার দিকে আমি যখন আবার সেই চত্বরে ফিরে এলাম, তখন দেখলাম পরিস্থিতি পুরোপুরি গোলমেলে হয়ে গেছে। সব জায়গায় সাউন্ড গ্রেনেড ফাটছে, আর প্রতিবাদকারীরা পুলিশের দিকে বোতল ছুড়ছে। একটা গাড়ি জ্বলছে, আর তার ধোঁয়া পুরো আকাশ ভারী করে তুলেছে। ‘নিকোলাস’ নামের একটা ওয়াইনের দোকানের কাচ ভেঙে ফেলা হয়েছে। কালো পোশাক পরা কিছু লোক সেখানে লুটপাট চালাচ্ছে- মদ খাওয়ার জন্য নয়, বরং পুলিশের গ্রেনেডের জবাবে তাদের দিকে ছুড়ে মারার জন্য ইটের টুকরো খুঁজতে।
এই হাঙ্গামার মধ্যে দাঁড়িয়ে কারোর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ ছিল না। তবে আমার মনে হয়েছে, এখানে বিভিন্ন ধরনের মানুষ জড়ো হয়েছিল: ব্ল্যাক ব্লকের লোকজন (যারা যেকোনো বিক্ষোভে শুধু ভাঙচুর করতে আসে), হলুদ ভেস্ট আন্দোলনকারী, সরকার আর পুলিশের ওপর রেগে থাকা তরুণ ও মধ্যবয়সী মানুষ, আর সুযোগ বুঝে মারপিট করতে আসা কিছু বখাটে ছেলে। যেকোনো রাজপথের আন্দোলনের মতোই এখানেও ছিল নানা মানুষ আর নানা মতলব।
ফরাসিদের একটা বড় অংশের বিশ্বাস, সরকারে থাকা মানুষদের টনক নড়াতে হলে একটু হইচই আর ভাঙচুর করতে হয়। আর সত্যি বলতে, অতীতে এর প্রমাণও পাওয়া গেছে। ফ্রান্সে এর আগে বিভিন্ন সময় ধর্মঘট বা কড়া অবরোধের মাধ্যমে- যেখানেও কিছু উগ্র মানুষ জিনিসপত্র পুড়িয়ে ফেলত- সরকারের ধনী-বান্ধব নীতিগুলোকে সফলভাবে ঠেকানো গেছে।
সেখানে পুরোনো সেই স্লোগান শোনা যাচ্ছিল- প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ পদত্যাগ করো। দাঙ্গাবাজদের বাদ দিলে সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে ছিল মূলত ভয় আর রাগ। পুলিশ যখনই একটা করে গ্রেনেড ফাটাচ্ছিল, শান্ত মানুষগুলো ভয় পেয়ে ছুটোছুটি করছিল, কিন্তু আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেদের জায়গায় শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। আর দাঙ্গাবাজরা ইট-পাটকেল ছুড়েই যাচ্ছিল। এই রাগটা কেমন, তা বোঝা যায় বিক্ষোভের আগের দিন দেখা একটা পোস্টার দেখে। তাতে লেখা ছিল: “আশা হারিয়ে ফেলেছি, ১৭ তারিখে তা আবার খুঁজতে আসব। সবকিছুতেই ঘৃণা। আমরা তো নরকেই আছি, ১৭ তারিখে দেখা হবে।”
তাহলে এখন কী হবে? ১৮০০-র বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করার পর এই মানুষগুলোর, এই আন্দোলনের আর এই দাঙ্গাগুলোর পরিণতি কী দাঁড়াবে?
ফরাসিদের একটা বড় অংশের বিশ্বাস, সরকারে থাকা মানুষদের টনক নড়াতে হলে একটু হইচই আর ভাঙচুর করতে হয়। আর সত্যি বলতে, অতীতে এর প্রমাণও পাওয়া গেছে। ফ্রান্সে এর আগে বিভিন্ন সময় ধর্মঘট বা কড়া অবরোধের মাধ্যমে- যেখানেও কিছু উগ্র মানুষ জিনিসপত্র পুড়িয়ে ফেলত- সরকারের ধনী-বান্ধব নীতিগুলোকে সফলভাবে ঠেকানো গেছে।
এই ধুলাবালি থিতিয়ে আসার পর রাজনীতিতে এর কী প্রভাব পড়বে? কট্টর ডানপন্থি নেতা মেরিন ল্য পেন এই সুযোগে জিনিসের দাম বাড়ায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের পক্ষ নেওয়ার ভাব করছেন এবং একই সঙ্গে যারা লুটপাট করেছে তাদের দোষ দিচ্ছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ফরাসি জনগণ একদিকে ‘সরকারের অতিরিক্ত কর ও কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি’ এবং অন্যদিকে ‘উগ্রপন্থিদের সহিংসতার’ মাঝে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে। তিনি ফরাসিদের প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর ‘বিষাক্ত নীতি’ থেকে বাঁচানোর এবং উগ্র বামপন্থিদের সহিংসতা থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে তিনি গোল গোল কথা বলে কৌশলে এড়িয়ে গেছেন যে, তার নিজের দলই সরকারের চেয়েও বেশি মানুষের খরচ কমানোর বা কৃচ্ছ্রসাধনের বাজেট প্রস্তাব করেছে। তবে খবরের চ্যানেলে চ্যানেলে আগুন আর লুটপাটের যেসব ছবি দেখানো হচ্ছে, তা মানুষের মনে আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার তার দাবিকেই জোরালো করছে।
অন্যদিকে, ফরাসি বামপন্থিরা (যাদের মূল নেতৃত্বে আছেন জ-ল্যুক মেলাশো) বিক্ষোভকারীদের পক্ষ নিয়েছেন এবং মানুষের এই ক্ষোভকে সামনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তারা দাঙ্গাবাজদের সহিংসতার চেয়ে পুলিশের সহিংসতার ওপরেই বেশি জোর দিচ্ছেন। এই সুযোগে বামপন্থিরাও রাজনৈতিক ফায়দা তুলে নিতে পারে।
সরকার যতই তাদের বাজেট নিয়ে একগুঁয়েমি করুক না কেন, যেকোনো মুহূর্তে এমন সহিংস বিক্ষোভ আবার ঘটতে পারে। টিয়ার গ্যাস দিয়ে সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখা গেলেও, মানুষের এই ক্ষোভ ও বিক্ষোভকে বেশিদিন আটকে রাখা যাবে না।
লেখক: অলিভার হেইন্স যুক্তরাজ্যের একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও গবেষক
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনিরুল হক ফিরোজ
