ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাটের দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন শ্রমিক নেতারা। তাঁদের প্রশ্ন, এস আলম, বেক্সিমকো ও নাসা গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের কারণে ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে জনগণের করের টাকা থেকে কেন ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে? তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্টদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে ব্যাংকের ক্ষতি পূরণের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের আশু মজুরি বৃদ্ধি ও নতুন মজুরি কাঠামো কেন জরুরি’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে বক্তব্য দেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাবেক গবেষণা পরিচালক ও নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের বর্তমান সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ, গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি আহসান হাবীব বুলবুল, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু এবং সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফীসহ অন্যরা।
সেমিনারে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমান মজুরি কাঠামোয় শ্রমিকদের খাদ্য, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত ভাতার ব্যবস্থা নেই। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি কাঠামো নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ খাতের প্রকৃত আয় ও মুনাফার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। এ শিল্পের মালিকেরা শুধু পোশাক খাতেই বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং বিভিন্ন খাতেও তাঁদের বিনিয়োগ রয়েছে। মালিকেরা উল্লেখযোগ্য মুনাফা করবেন, অথচ শ্রমিকেরা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত থাকবেন—এ ধরনের বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়।
শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে মজুরি কাঠামোতে শিক্ষা ও বিনোদন ভাতা যুক্ত করারও দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের আগেই সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে। তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আলোচনা না করে রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা মালিক ও শ্রমিক—কোনো পক্ষের জন্যই সুফল বয়ে আনবে না।
তিনি বলেন, করোনাকালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর দেখা গেছে, প্রায় প্রত্যেক শ্রমিকের নিজস্ব মোবাইল ফোন রয়েছে। তাঁদের অনেকের কাছে স্মার্টফোনও আছে এবং তাঁরা এটিএম ব্যবহার করতে পারেন। তাঁর মতে, এসব বিষয় শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
মাহমুদ হাসান খান আরও বলেন, অন্যান্য শিল্প খাতের পরিস্থিতি বিবেচনা না করে শুধু তৈরি পোশাকশিল্পে অতিরিক্ত হারে মজুরি বাড়ানো হলে অন্য খাতের শ্রমিকেরা এ শিল্পে চলে আসতে পারেন। এতে শ্রমবাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সামগ্রিক শিল্প খাতের পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষ বলেন, শ্রমিকদের শ্রম ও ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে তৈরি পোশাকশিল্প। শ্রমিকেরা নিজেরা সংগঠিত হয়ে আন্দোলন না করলে সরকার কিংবা মালিকপক্ষ তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বতঃস্ফূর্তভাবে মজুরি বাড়াবে না।
তিনি বলেন, মালিকপক্ষ প্রায়ই শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়। কিন্তু আন্দোলন ছাড়া শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায় করা সম্ভব নয়। তাই ন্যায্য মজুরি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে।
