শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে জমে উঠেছে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে হাট প্রাঙ্গণ। ঢাক-ঢোল, কাঁশি-সানাই, করতাল ও বাঁশির সম্মিলিত সুরে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরছেন শিল্পীরা। তাদের পরিবেশনা শুনে পছন্দের বাদকদল বেছে নিচ্ছেন পূজা আয়োজকরা। দল ও বাদ্যযন্ত্রের ধরন অনুযায়ী ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকারও বেশি সম্মানিতে চলছে দরদাম ও চুক্তি।
প্রতি বছরের মতো এবারও কটিয়াদী সদরের পুরান বাজার এলাকায় বসেছে ঐতিহ্যবাহী এ হাট। গত বুধবার সকাল থেকে জমতে শুরু করা হাট চলে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ষষ্ঠীর গভীর রাত পর্যন্ত। বাজার কমিটি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এবার দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দুই শতাধিক বাদকদল হাটে এসেছেন। তবে হাটের সবচেয়ে বেশি জমজমাট অবস্থা দেখা যায় শেষের দিকে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে হাটে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকের গর্জন আর নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখর পুরো এলাকা। একেকটি দল নিজেদের বাদ্যযন্ত্র ও বাজানোর দক্ষতা তুলে ধরছে। পূজা আয়োজকরা বিভিন্ন দলের পরিবেশনা শুনে পছন্দের দল নির্বাচন করছেন। এরপর চলছে দরদাম ও চুক্তি। যে দলের বাজনা আয়োজকদের মন কাড়ছে, নির্দিষ্ট সম্মানির বিনিময়ে সেই দলকেই দুর্গাপূজার মণ্ডপে বাজানোর জন্য চুক্তিবদ্ধ করা হচ্ছে।
নরসিংদীর শিবপুর থেকে হাটে আসা পূজা আয়োজক সুভাশিস সূত্রধর বলেন, ‘প্রতি বছর দুর্গাপূজার জন্য বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের দল নিতে এই ঐতিহ্যবাহী হাটে আসি। সকাল থেকে অনেকের বাজনা শুনেছি। এর মধ্যে একটি দলকে পছন্দ হয়েছে। তারা ভালো বাজায়। ৯০ হাজার টাকায় তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থেকে আসা তাপস বিশ্বাস বলেন, ‘এবারই প্রথম এই হাটে এসেছি। এসে মুগ্ধ হয়েছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে বাদকদল এসেছে। তাদের মধ্যে বিক্রমপুরের পাঁচ সদস্যের একটি দল পছন্দ করেছি। ৮৫ হাজার টাকায় তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।’
বিক্রমপুর থেকে ১০ সদস্যের দল নিয়ে হাটে এসেছেন রণজিৎ মণি দাস। তার দলের সঙ্গে রয়েছে ঢাকসহ আধুনিক বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। দলটির জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানি চাইতে দেখা গেছে।
এদিকে, ঢাকের হাট এখন আর শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আয়োজন নয়; এটি হয়ে উঠেছে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে এক সর্বজনীন মিলনমেলা। বাদ্যযন্ত্রের সুর উপভোগ করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। ঢাক-ঢোলের সম্মিলিত বাদ্য আর শিল্পীদের পরিবেশনায় পুরো হাট পরিণত হয় এক উৎসবের প্রাঙ্গণে।
পাঁচ শতাব্দীর ঐতিহ্যের পেছনের ইতিহাস: স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় ৫০০ বছর আগে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের সময় কটিয়াদীর ঢাকের হাটের সূচনা হয়। রাজা কটিয়াদীর চারিপাড়ায় তার রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। পূজায় ঢাক, ঢোল ও বাঁশি বাজানোর জন্য সেরা শিল্পীদের খুঁজতে বিক্রমপুর পরগনায় বার্তা পাঠানো হয়। সেই আহ্বানে বহু বাদ্যযন্ত্রশিল্পী নৌপথে কটিয়াদীতে আসেন। রাজা নিজে তাদের বাজনা শুনে সেরা দল বেছে নেন। সেই থেকেই দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কটিয়াদী পুরান বাজারে এই হাট বসার প্রচলন শুরু হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শ্রীমা সংঘ হাটটির তত্ত্বাবধান করে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জীবন কুমার সাহা বলেন, ‘রাজা নবরঙ্গ রায়ের আমল থেকেই এই ঐতিহ্যের যাত্রা। হাটে আসা বাদকদের থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে সংগঠনটি। কোনো বাদকদল ভাড়ায় যেতে না পারলে তাদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থাও করা হয়।’
মোবাইল ফোনে চুক্তি, কমছে ঢাকিদের আগমন: ঐতিহ্যবাহী এ হাটে আগের তুলনায় ঢাকিদের আগমন কমেছে বলে জানিয়েছেন আয়োজক, স্থানীয় বাসিন্দা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা। তাদের মতে, মোবাইল ফোনে যোগাযোগের সুযোগ বাড়ায় এ পরিবর্তন এসেছে।
হাটে এসে একবার চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর পূজা আয়োজক ও বাদকদলের মধ্যে মুঠোফোনে যোগাযোগের তথ্য বিনিময় হয়। পরবর্তী সময়ে কোনো দলের পরিবেশনা ভালো লাগলে আয়োজকরা সরাসরি ফোন করে সেই দলের সঙ্গে দরদাম ও চুক্তি করেন। ফলে উভয় পক্ষেরই পরের বছর হাটে আসার প্রয়োজন কমে যায়।
নাম ঢাকের হাট, কেনাবেচা হয় না বাদ্যযন্ত্র: নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে ঢাক-ঢোল কিংবা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। বরং বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা তাদের দক্ষতা ও পরিবেশনা তুলে ধরেন, আর পূজা আয়োজকরা বাজনা শুনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। দলের সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্রের ধরন ও শিল্পীদের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় সম্মানির পরিমাণ।
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, ‘বিক্রমপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদী, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাদকদল হাটে এসেছেন। ঢাক-ঢোলের পাশাপাশি বাঁশি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা, ঝনঝনিসহ বিভিন্ন আধুনিক বাদ্যযন্ত্রও নিয়ে এসেছেন তারা।’
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন বলেন, ‘শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে এই ঐতিহ্যবাহী হাট এখন কেবল বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের চুক্তির জায়গা নয়, বরং দুর্গোৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
