মেহেরপুর সদর উপজেলার গহরপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কাজলা নদীর খনন করা মাটি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। দরপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নতুন করে দরপত্র আহ্বান কিংবা আগের নিলাম নবায়নের অনুমোদন নিশ্চিত না করেই নদীর পাড়ে স্তূপ করে রাখা মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
মেহেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) সূত্রে জানা গেছে, দরপত্রের মাধ্যমে বলিয়ারপুর গ্রামের জিয়াখাল ও গহরপুর গ্রামের কাজলা নদীর পুনঃখননকাজে উত্তোলিত মাটি বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়।
গত ১৫ জুন মেহেরপুর পানি উন্নয়ন উপবিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শান্ত দত্তের স্বাক্ষরিত পরিপত্রে কাজলা নদীর পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় ১৩ দশমিক ৪০০ কিলোমিটার থেকে ১৩ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত অংশ থেকে উত্তোলিত মাটি নিলামের মাধ্যমে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়। ‘লট নং-নিলাম-০৬/২০২৫-২৬’-এর আওতায় ৬ হাজার ৭৮৯ দশমিক ৭৫ ঘনমিটার মাটি অপসারণের জন্য সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ টাকায় এস এম ফিরোজুর রহমানকে নির্বাচিত করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট নিলামের মেয়াদ গত ৩০ জুলাই শেষ হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও মেহেরপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম ফিরোজুর রহমান এবং তাঁর সহযোগী মিয়ারুল ও কিতাব নদীর পাড়ে স্তূপ করে রাখা মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করছেন। তবে ফিরোজুর রহমানের দাবি, আগের দরপত্রের মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে আবেদন করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, নিলামের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কোনো দরপত্র আহ্বান কিংবা আগের নিলাম নবায়নের অনুমোদন ছাড়াই মাটি অপসারণ ও বিক্রি অব্যাহত রয়েছে।
সরেজমিনে গহরপুর এলাকায় কাজলা নদীর পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, নদী খননের পর উত্তোলিত মাটি স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে এস্কেভেটরের সাহায্যে মাটি কেটে ট্রাক্টরে বোঝাই করা হচ্ছে। পরে এসব মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
নিলামপত্রের অন্যতম শর্ত অনুযায়ী, মাটি অপসারণের পুরো প্রক্রিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সম্পন্ন করতে হবে এবং অপসারিত মাটির পরিমাণ পরিমাপ রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করতে হবে। কিন্তু মাটি সরানোর ক্ষেত্রে এসব শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বাপাউবোর কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও তদারকি ছাড়াই মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া এস্কেভেটরচালকের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন একটি তথ্য পাওয়া গেছে। মাটি খননের কাজে ব্যবহৃত এস্কেভেটরটি বলিয়ারপুর পুলিশ ক্যাম্পে কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল রবিউলের বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির নীতিমালা উপেক্ষা করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এস্কেভেটর ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা করে আসছেন। রবিউল এর আগে মুজিবনগর থানায় কর্মরত ছিলেন। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, মুজিবনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনি এস্কেভেটর ভাড়ার ব্যবসা করতেন এবং প্রায় চার বছর ধরে এ ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কাজলা নদীর মাটি অপসারণের কাজে বর্তমানে ব্যবহৃত এস্কেভেটরটি কনস্টেবল রবিউলের বলে নিশ্চিত করেছেন চালক।
এ বিষয়ে জানতে কনস্টেবল রবিউলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এস্কেভেটর ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। বিষয়টি নিয়ে ভালোভাবে খোঁজখবর নিতে বলেন তিনি।
সরকারি চাকরির নীতিমালা উপেক্ষা করে চাকরির পাশাপাশি এস্কেভেটর ভাড়ার ব্যবসা পরিচালনার বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিদুর রহমান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে পরে কথা বলবেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
দরপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে এস এম ফিরোজুর রহমান বলেন, “কাজলার টেন্ডারটা আমার নামে। মেয়াদের আবেদন করা আছে। রবিবার-সোমবারে হাতে পাব। কাজটা শুরু করেছি গত পরশুদিন। নানা জটিলতা ছিল, বৃষ্টির কারণে শুরু করা হয়নি। যদি প্রয়োজন হয় আমি কাগজ নিয়ে ওখানে যাচ্ছি না হলে শহরে আসলে আমি কাগজ দেখাচ্ছি।”
মাটি অপসারণের বিষয়ে জানতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাঈম কামাল, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) শান্ত দত্ত এবং উপসহকারী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁরা ফোন ধরেননি।
পরে সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, দরপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে সেখানে কাজ করতে হলে উপজেলা কমিটি ও জেলা কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন। জেলা কমিটি অনুমোদন দিলেই মাটি অপসারণ করা যাবে। তবে সংশ্লিষ্টরা সেই অনুমোদন পেয়েছেন কি না, তা তিনি জানেন না। তাঁর ভাষ্য, যতটুকু জানা আছে, কাজটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। রবিবার অফিসে গেলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
এমএ
