সংবাদ · সাধারণ
যৌতুক ও নারী নির্যাতন মামলা: সাক্ষ্য-প্রমাণের গুরুত্ব
১২/১০/২০২৬

আমাদের সমাজে পারিবারিক কলহ, বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাকের পর, অনেক সময় ফৌজদারি মামলার রূপ নেয়। যৌতুক নিরোধ আইন বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো নারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি হলেও, কখনো কখনো এসব আইন ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে আদালত ও আইন একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে কীভাবে সুরক্ষা দেয়?ধরা যাক, ‘ক’ ও ‘খ’ নামে এক দম্পতির দীর্ঘদিনের সংসারে কলহ চলছিল। একপর্যায়ে স্বামী ‘ক’ তার স্ত্রী ‘খ’-কে তালাক দেন এবং তা যথাযথভাবে ডাকযোগে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে ও স্ত্রীর ঠিকানায় পাঠান। তালাকের প্রায় এক মাস পর ‘খ’ একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ করা হয়, তালাকের দিনই তাকে যৌতুকের দাবিতে নির্মমভাবে মারধর করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।সাক্ষীরা একে অপরের বক্তব্যের সঙ্গে মিল রাখতে পারেননি; ঘটনার সময় ও তারিখ নিয়ে পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন।কোনো প্রতিবেশী বা নিরপেক্ষ সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা সবাই বাদিনীর নিকটাত্মীয়।চিকিৎসাসনদে নাম, বয়স ও অন্যান্য তথ্যে গরমিল পাওয়া যায়। যিনি রোগীকে শনাক্ত করেছেন, তিনি বাদী বা আসামি কারও প্রতিবেশীও নন।তদন্ত প্রতিবেদনে যৌতুক দাবির নির্দিষ্ট তারিখ বা সময় উল্লেখ নেই।এজাহার দায়েরে দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছে, যার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই।আসামিপক্ষ তালাকের বৈধ কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করেছেন, যা বাদীপক্ষ অস্বীকার করতে পারেননি।এমন পরিস্থিতিতে ফৌজদারি বিচারের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলো কী বলে?১. আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর একটি হলো—সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক আসামিকে নির্দোষ বলে গণ্য করতে হবে। বিচারের প্রতিটি পর্যায়ে এই নীতি অনুসরণ করতে হয় (৪২ ডিএলআর ৩১, আপিল বিভাগ)।২. বিচারকার্যে আবেগ, অনুভূতি বা ব্যক্তিগত ধারণার কোনো স্থান নেই। ন্যায়বিচার অন্ধ—এখানে কেবল আইন ও নথিতে থাকা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় (১৮ বিএলটি ৪৬৫, আপিল বিভাগ)।৩. যখন মামলার সব সাক্ষীই বাদীপক্ষের আত্মীয়স্বজন এবং কোনো নিরপেক্ষ বা স্বার্থহীন সাক্ষীকে জেরা করে পরীক্ষা করা হয় না, তখন আদালত ওই সাক্ষ্য সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করেন। প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—স্বার্থযুক্ত সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা দেওয়ার আগে সমর্থনকারী প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে হয়। আদালতের দায়িত্ব শুধু সাজা নিশ্চিত করা নয়, বরং প্রয়োজনে খালাস দেওয়াও (৪৮ ডিএলআর ১৮৪)।আইন আরও বলে, একজন অভিযোগকারী বা সংবাদদাতাও স্বার্থযুক্ত সাক্ষী হতে পারেন। স্বতন্ত্র ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দ্বারা তার বক্তব্য সমর্থিত না হলে তা সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন (৪৪ ডিএলআর ৫৫৪)।৪. সাক্ষীদের বক্তব্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অমিল, পরস্পরবিরোধিতা বা প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি থাকলে আসামি ‘সন্দেহের সুবিধা’ পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন। অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে তাকে খালাস দেওয়া হয় (৪৩ ডিএলআর ৬, আপিল বিভাগ)।৫. ঘটনার পর সন্তোষজনক কারণ ছাড়া এজাহার দায়েরে বিলম্ব হলে আদালত তা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করেন। বিলম্বের সময় অভিযোগের কাহিনি সাজানো হয়ে থাকতে পারে কি না, তা-ও যাচাই করা হয় (৪৪ ডিএলআর ৪৯২)।৬. আসামিপক্ষের বক্তব্য, যেমন তালাকের ঘটনা, সম্পূর্ণ অকাট্যভাবে প্রমাণিত না হলেও তা যদি যুক্তিসংগতভাবে সত্য বলে বিবেচিত হতে পারে, তাহলে মামলার সামগ্রিক অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে আসামি সন্দেহের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন। এটি করুণা নয়, বরং তার আইনগত অধিকার (৭ বিএলটি ০৩)।৭. সন্দেহ যতই তীব্র হোক না কেন, তা কখনো প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। সামান্য বা ক্ষীণ সন্দেহের ভিত্তিতে নয়, বরং অভিযোগের বিষয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ থেকে গেলে আসামি খালাস পাওয়ার অধিকারী হন (৭ বিএলডি, আপিল বিভাগ, ২৬৫)।একটি ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ আনাই যথেষ্ট নয়; তা আইন ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রপক্ষের। যেখানে সাক্ষীরা পরস্পরবিরোধী কথা বলেন, স্বতন্ত্র সাক্ষী অনুপস্থিত থাকেন, চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রমাণে অসংগতি থাকে এবং এজাহার দায়েরে অস্বাভাবিক বিলম্ব ঘটে, সেখানে আদালতকে সব প্রমাণ সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করতে হয়। অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে আসামি সন্দেহের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হন।এই নীতিগুলো নারী নির্যাতনবিরোধী আইনের গুরুত্ব কমায় না; বরং নিশ্চিত করে যে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা যেমন ন্যায়বিচার পান, তেমনি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো নিরপরাধ ব্যক্তিও যেন অন্যায়ভাবে দণ্ডিত না হন। ন্যায়বিচার একটি পবিত্র দায়িত্ব। তা কেবল আইন, প্রমাণ ও যুক্তির নিরিখেই সম্পন্ন হতে পারে, আবেগ বা পূর্বধারণার ভিত্তিতে নয়।[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]
মূল প্রতিবেদনে যান ↗