সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির আটক, সাজা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। গত ১৪ অক্টোবর মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তার ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে পৃথক অভিযোগে সৌদি আরবের কারাগারে বন্দি ছিলেন। তবে তাদের মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলকে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানায়নি। এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কনস্যুলেটের কাছে থাকা বন্দিদের তালিকায়ও তাদের সাজা
সম্পর্কে কোনো তথ্য ছিল না।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল কার্যালয়ের শ্রম উইংয়ের পাঠানো একটি ‘গোপনীয়’ চিঠিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেটের পাওয়া বন্দিদের তালিকা অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম আব্দুল বশিরকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে আটক করা হয়। পরদিন ২ আগস্ট ব্যভিচারের অভিযোগে আটক করা হয় সুইটি আক্তারকে। নজরুল জেদ্দা সংশোধনাগারে এবং সুইটি জেদ্দা মহিলা কারাগারে বন্দি ছিলেন। তারা দুজনই সৌদি আরবের ‘আল মাজাল কোম্পানিতে’ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
চিঠিতে বলা হয়, বন্দিদের তালিকার সাত নম্বর কলামে রায় ঘোষিত কয়েদিদের সাজার সংক্ষিপ্ত বিবরণ উল্লেখ করার বিধান থাকলেও নজরুল ও সুইটি— কেউই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন, এমন কোনো তথ্য সেখানে ছিল না। ফলে তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছিল কিনা, কখন তা ঘোষণা করা হয়েছিল এবং কোন আইনি প্রক্রিয়ায় সেই রায় কার্যকর করা হয়েছে, সে বিষয়ে কনস্যুলেটের কাছে আগাম তথ্য ছিল না।
কনস্যুলেটের চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সৌদি আরবে সাইবার অপরাধ আইন ও ব্যভিচারের অভিযোগে কোনো বাংলাদেশিকে এর আগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজির নেই বলে তাদের জানা রয়েছে। তবে দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, আদালতের রায় এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি ভিত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চিঠিতে উল্লেখ করা হয়নি।
জেদ্দা কনস্যুলেটের আওতাধীন সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে চারিত্রিক অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় ৩০৬ বাংলাদেশি আটক রয়েছেন বলেও চিঠিতে জানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। এসব সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির কারাদণ্ডের মেয়াদ সর্বনিম্ন এক মাস থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছর। এ ছাড়া সাইবার বা তথ্যপ্রযুক্তি আইনে অপরাধের অভিযোগে মক্কায় পৃথক তিনটি মামলায় বাংলাদেশিদের ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে সৌদি আরবের আদালতে বিচারপ্রক্রিয়ায় ভাষাগত সহায়তার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, সৌদি আরবের ক্রিমিনাল কোর্টসহ অন্যান্য আদালতে শুনানির সময় ‘মারকাযুত তারজামাহ আল মুওয়াহহাদ’ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনুবাদের সহায়তা নেওয়া হয়। এ ব্যবস্থায় বিচারিক কার্যক্রমে আসামির পক্ষে অনুবাদক হিসেবে বাংলাদেশ মিশনের প্রতিনিধিদের যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে না।
তবে নজরুল ও সুইটির বিচার চলাকালে তারা পর্যাপ্ত ভাষাগত সহায়তা পেয়েছিলেন কিনা, তাদের পক্ষে কোনো দোভাষী বা আইনজীবী নিয়োজিত ছিলেন কিনা, কিংবা তারা অভিযোগ ও আদালতের রায় যথাযথভাবে বুঝতে পেরেছিলেন কিনা, সে বিষয়ে চিঠিতে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা চেয়ে কনস্যুলেটে কোনো আবেদন বা যোগাযোগ করা হয়নি বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো তথ্য না পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, কনস্যুলেট ইতোমধ্যে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি ‘নোট ভার্বাল’ পাঠিয়েছে। এতে দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের অনুলিপি এবং সংশ্লিষ্ট মামলার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
কনস্যুলেট জানিয়েছে, রায়ের অনুলিপি ও প্রয়োজনীয় তথ্য হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী প্রতিবেদন পাঠানো হবে। তবে আদালতের রায় ও মামলার নথি পাওয়া না পর্যন্ত দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, মৃত্যুদণ্ডের আইনি ভিত্তি, আপিলের সুযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
