পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নে সরকারি সার ও বীজ ডিলার নিয়োগের সুপারিশ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। ১৬ জন আবেদনকারীর তথ্য যাচাই-বাছাই ও তদন্ত প্রতিবেদনে অসংগতি থাকার পরও তিন আবেদনকারীর নাম কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে সব শর্ত পূরণ করেও নিজের নাম সুপারিশ তালিকায় না থাকার দাবি করেছেন এক আবেদনকারী। অভিযোগকারীদের দাবি, জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন সার ও বীজ ডিলার নিয়োগ ও মনিটরিং কমিটি আবেদনকারীদের যোগ্যতা এবং তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অসংগতিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি।
এ ঘটনায় স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। অভিযোগকারীরা বলেন, সুপারিশ তালিকায় থাকা মেসার্স লিয়ন এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স শাহজাহান খান ও মেসার্স আসিক ট্রেডার্সের যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মেসার্স লিয়ন এন্টারপ্রাইজের ক্ষেত্রে অভিযোগ করা হয়েছে, একই পরিবারের একাধিক সদস্য ভিন্ন নামে আবেদন করেছেন এবং তিনটি আবেদনের বিপরীতে একটি গোডাউন দেখানো হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি ডিলার নিয়োগের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন।
মেসার্স শাহজাহান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি অমরখানা ইউনিয়নের ভোটার নন; তার ভোটার নিবন্ধন পঞ্চগড় পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ভোটার হওয়ার শর্ত তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে বিষয়টি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অন্যদিকে মেসার্স আসিক ট্রেডার্সের নিজস্ব গোডাউন এবং জমির মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে আপত্তি তুলেছেন তারা। অভিযোগ অনুযায়ী, পৈতৃক জমিতে থাকা একটি অবকাঠামো গোডাউন হিসেবে দেখানো হলেও জমির বৈধ মালিকানা বা বণ্টনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি দাখিল করা হয়নি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তিন আবেদনকারী ও নিয়োগ কমিটির বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন। মেসার্স তিন বোন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ছোলায়মান আলীর দাবি, ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করে তিনি আবেদন করেছিলেন।
তিনি বলেন, গোডাউন, জমির কাগজপত্র, ব্যাংক সচ্ছলতা এবং স্থানীয় ভোটার হওয়ার প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও তার নাম কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সুপারিশ তালিকায় রাখা হয়নি।
ছোলায়মান আলী ও স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য যথাযথভাবে বিবেচনা না করায় প্রকৃত যোগ্য আবেদনকারীরা বঞ্চিত হতে পারেন। তাদের আরও দাবি, নাম বাদ দেওয়ার কারণ এবং আবেদনকারীদের মূল্যায়নের নম্বর বা মানদণ্ড প্রকাশ করা হলে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন ডিলার নিয়োগ ও মনিটরিং কমিটি কীভাবে বিতর্কিত বলে দাবি করা আবেদনকারীদের নাম সুপারিশ করেছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের মতে, সরকারি সার ও বীজ বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে প্রত্যেক আবেদনকারীর যোগ্যতা একই মানদণ্ডে যাচাই করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের মতে, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত না করা হলে কৃষকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। সরকারি নীতিমালা মেনে ডিলার নিয়োগ এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে কৃষকদের কাছে ন্যায্যমূল্যে সার ও বীজ পৌঁছানো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলো হলো : ১. অমরখানা ইউনিয়নের ১৬ জন আবেদনকারীর তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট মন্তব্য পুনরায় যাচাই করা। ২. মেসার্স লিয়ন এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স শাহজাহান খান ও মেসার্স আসিক ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে ওঠা ভোটার পরিচয়, গোডাউন, জমির মালিকানা ও একই পরিবারের একাধিক আবেদনসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করা। ৩. মেসার্স তিন বোন ট্রেডার্সের দাখিল করা কাগজপত্র পুনর্মূল্যায়ন করে নাম বাদ দেওয়ার কারণ প্রকাশ করা। ৪. তদন্তে অনিয়ম বা তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। ৫. সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে একই সরকারি নীতিমালা ও মূল্যায়ন মানদণ্ড প্রয়োগ করে স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা।
অভিযোগকারীরা মনে করেন, সার ও বীজ ডিলার নিয়োগ শুধু ব্যবসায়িক লাইসেন্স দেওয়ার বিষয় নয়; এটি কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তাই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
বিআলো/আমিনা