রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মাদারীপুর শহরের পরিচিত মুখ ও সমাজসেবক লোকমান মোল্লার নিয়ন্ত্রিত সাত্তার গ্রুপের বিরুদ্ধে কাগুজে প্রতিষ্ঠান ও আত্মীয়স্বজনের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় এক হাজার ৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ ও খেলাপি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে দানবীর ও সফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত লোকমান মোল্লা এই খাতের আড়ালে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে জিম্মি করে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাদারীপুর শহরের কলেজ রোডের লোকমান মোল্লা বিভিন্ন হাসপাতাল, কমিউনিটি সেন্টার ও পাটের গুদাম পরিচালনার মাধ্যমে এলাকায় জনহিতৈষী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কিন্তু এই সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে গড়ে উঠেছে এক সুপরিকল্পিত আর্থিক কেলেঙ্কারির নেটওয়ার্ক। সাত্তার জুট অ্যান্ড ফাইবারস, সাত্তার ট্রেডিং কোম্পানি, সেভেন হেভেন, স্টেয়ার ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল, এসএলজি বেস্ট, এসএলজি ইউনিক ও স্প্যানিস্টার লিমিটেডের মতো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক থেকে এই বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়েছে। কাগজপত্রে এসব প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক ও বড় আকারের ব্যবসার হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে মতিঝিলসহ বিভিন্ন প্রদত্ত ঠিকানায় তাদের কোনো অস্তিত্ব বা কার্যক্রম খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এই ঋণ কেলেঙ্কারিতে আত্মীয়স্বজনকে ব্যবহার করার এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। লোকমান মোল্লার প্রতিবেশী ও চাচাতো ভাই বাচ্চু হাওলাদারকে একাধিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান দেখানো হলেও তাঁর পরিবার জানিয়েছে, তিনি এর কিছুই জানেন না এবং বাস্তবে তাঁর কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ নেই। একইভাবে লোকমান মোল্লার স্ত্রী, শ্বশুর এবং ভাতিজা নূরে আলম রানাকেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও পরিচালকের দায়িত্বে রাখা হয়েছে। মূলত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখে ঋণের সম্পূর্ণ দায় ও ঝুঁকি আত্মীয়স্বজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, এই মুহূর্তে সাত্তার গ্রুপের কাছে অগ্রণী ব্যাংকের প্রায় ছয়শ ৬৫ কোটি এবং রূপালী ব্যাংকের পাওনা মিলিয়ে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৫৫ কোটি টাকা। ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, বারবার তাগাদা দেওয়া এবং ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ প্রদান করা সত্ত্বেও সাত্তার গ্রুপ তাতে কোনো সাড়া দেয়নি। বাধ্য হয়ে ব্যাংকগুলো অর্থঋণ আদালতে একাধিক মামলা দায়ের করেছে। অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী জামানত বাজেয়াপ্ত এবং সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে এই পাওনা অর্থ আদায়ের কঠোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো ওয়াহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে পার পাওয়ার অভিযোগও কম নয়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, লোকমান মোল্লা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থানও বদলেছেন। একসময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত হলেও সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে তা ব্যানার ও পোস্টারে ব্যবহার করে নিজের প্রভাব অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। এই রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক লবিংকেই ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন ও সুরক্ষার প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভেতরের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অগ্রণী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, লোকমান মোল্লার কাগুজে প্রতিষ্ঠানের গুদামে রক্ষিত পণ্যের পরিদর্শনে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ার পর ইতোমধ্যে কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের যথাযথ যাচাই-বাছাই, জামানতের সঠিক মূল্যায়ন কিংবা ব্যবসায়িক সক্ষমতা বিবেচনা না করে কীভাবে হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হলো, তা নিয়েও তীব্র সমালোচনা চলছে। ব্যাংকারদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল নজরদারির সুযোগে গড়ে ওঠা এই খেলাপি সংস্কৃতির দায় শুধু ঋণগ্রহীতার একার নয়, এর সঙ্গে জড়িত ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকাও সমানভাবে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বর্তমানে পুরো বিষয়টি অর্থঋণ আদালত এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার বিবেচনায় রয়েছে। লোকমান মোল্লার সম্পদের প্রকৃত উৎস, বেনামি প্রতিষ্ঠানের আসল মালিকানা এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ উন্মোচনে একটি নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
