দেবী সরস্বতী সঙ্গীতের জন্য আমার কাছে সব সময়ই খুব কাছের। তিনি বিদ্যারও দেবী। তবে তাঁকে আরও একটি বিষয়ের জন্য খুব শ্রদ্ধা করি। জ্ঞান ও অজ্ঞানের মধ্যে যে সীমারেখা আছে, তা স্পষ্ট করে দেন তিনি। বিদ্যা অর্জনের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি খুব প্রয়োজন।
এই প্রসঙ্গে ছোটবেলায় শোনা একটি গল্প মনে পড়়ে যায়। ছোটবেলায় মায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, “সরস্বতীর বাহন কেন হাঁস?” সেই সময়ে মা বলেছিলেন, হাঁস এমন একটি প্রাণী যে দুধ ও জল একটা বাটিতে থাকলে দুটোকে আলাদা করে ফেলতে পারে। এটাই হয়তো সরস্বতীর বাহন হওয়ার বিশেষ শর্ত। আসলে আমাদের চোখের সামনে অনেক কিছু আসে। আজ উন্নত প্রযুক্তির যুগে, সব কিছুই খুব সহজলভ্য। চারিদিকে নানা তথ্য। তার মধ্যে থেকে কোনটা বেছে নেব আর কোনটা বাদ দেব, সেই জ্ঞানটা খুব প্রয়োজনীয়। দেবী সরস্বতীই সেই জ্ঞান প্রাপ্ত হতে আমাদের সাহায্য করেন।
আমার জীবনে অবশ্যই সরস্বতীর প্রভাব রয়েছে। তবে অনেকেই আমাকে সরস্বতীর সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁদের কাছে আমি সরস্বতীর প্রতিমূর্তি। অবশ্যই তাঁরা ভালবেসে ও শ্রদ্ধা থেকেই এই কথাগুলি আমাকে বলেন। কিন্তু আমি নিতান্তই সাধারণ মানুষ। এক জন সাধারণ মানুষের মধ্যে যা যা থাকে, আমিও তেমনই। আমরা কেউই ভগবান হয়ে যেতে পারি না। তবে এটা ঠিক, সরস্বতীর সঙ্গে তুলনা করলে দায়িত্ববোধ অনেকটা বেড়ে যায়। কেউ আমাকে সরস্বতীর প্রতিমূর্তি হিসাবে দেখছেন মানে, আমার এবং আমার সঙ্গীতের থেকে তাঁর প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশার কথা আমি অবশ্যই মাথায় রাখি। সেই প্রত্যাশাকে শ্রদ্ধা করে নিজের দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করে যাই।
ঠিক-ভুলের মাঝে পার্থক্য নির্ধারণের শক্তি দেন সরস্বতী।
চার পাশের মানুষের থেকে এমন প্রতিক্রিয়া পেলে অনেকে সেটাকেই বাস্তব ভাবতে শুরু করেন। আমার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। আসলে বাস্তবে আমি দেবী সরস্বতীর মতো শান্ত ও ক্ষুরধার বুদ্ধির অধিকারী নই। আমি খুবই চঞ্চল এবং কিছু ক্ষেত্রে ছড়ানোও। তবে মঞ্চে আমি যেমন, বা আমি যে ধরনের সঙ্গীতকে ধারণ করি, সেটার প্রয়োজনে নিজের মধ্যে শান্তি বজায় রাখতে হয়। আমরা তো সঙ্গীতের আধার। তাই সঙ্গীতের জন্যই মঞ্চে যে ভাবে নিজেকে তুলে ধরতে হয়, তা হয়তো শান্ত। কিন্তু বাস্তবে মানুষ হিসাবে আমি খুবই ছটফটে ও প্রচুর কথা বলতে ভালবাসি। তাই নিজেকে সরস্বতীর প্রতিমূর্তি বলে মনে করি না। অন্যদের মতোই তাঁকে পুজো করি।
মনে আছে, ছোটবেলায় বাবাকে বলেছিলাম, “সরস্বতী তো গানের দেবী। ওঁর কেন বিসর্জন হবে?” তার পর থেকে আমাদের বাড়িতে দেবী প্রতিমার বিসর্জন হয় না। পরের বছর নতুন প্রতিমা এলে, তখন আগের বছরের প্রতিমার বিসর্জন হয়। যদিও বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, সরস্বতী শুধু সঙ্গীত বা বিদ্যার দেবী নন। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হল, ঠিক ও ভুলের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকলেও তা বোঝার শক্তি দেন তিনি।
পুজোআচ্চার বাইরে গিয়ে সরস্বতীকে নিয়ে একটা গর্ব রয়েছে আমার। আমি এক জন নারীবাদী। নারী হয়ে জন্মে আমি সত্যিই গর্বিত। সনাতন ধর্মে বিদ্যার দেবী এক জন নারী, এ জন্যও আমার গর্ববোধ হয়। এই সংস্কৃতির অংশ হতে পেরে আমার খুব ভাল লাগে। আমি তথাকথিত ধর্মের আচারবিচারে খুব একটা বিশ্বাসী নই। কিন্তু আমি এই দর্শনকে সম্মান করি যেখানে এক জন দেবীকে বিদ্যার প্রতীক হিসাবে ভাবা হয়।
বিদ্যার প্রতিনিধিত্ব আসলে নারীরাই ভাল করে করতে পারেন। বিদ্যার জন্য যে নিয়মানুবর্তিতা, স্থিরতা, লালন করার ক্ষমতার প্রয়োজন, তা এক জন নারীর মধ্যেই বিরাজ করে। শুধুমাত্র ক্ষমতায়ন থাকলে বিদ্যা হয় না। তখন যুদ্ধ বেধে যায়। বরং ক্ষমতায়নের সঙ্গে বিনয়েরও প্রয়োজন। নারীরা সেটা পারেন। ক্ষমতায়নের সঙ্গে তারা পরের প্রজন্মকে লালন করতে জানে এবং কমনীয়তাও থাকে সেখানে। সনাতন ধর্মেও এমন এক জন নারীকেই বিদ্যার দেবী হিসাবেই বেছে নেওয়া হয়েছে।
