ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি ধারাবাহিকভাবে সৌদি আরবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরে সৌদির বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরুর পর হুথিরা রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একাধিক হামলা চালিয়েছে।
গত শনিবার বিমানবন্দরটিতে চালানো এক হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। এ ঘটনায় সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করতে এবং সব ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের নাগরিকদের জন্য নতুন ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। এর রেশ না কাটতেই রোববার আবারও সেখানে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে হুথি।
এর আগে গত সপ্তাহে বিমানবন্দরটিতে আরও দুটি হামলার দায় স্বীকার করেছে হুথিরা।
হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডার
বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনী রয়েছে সৌদি আরবের। দেশটির সামরিক সক্ষমতার অন্যতম শক্তি উন্নত ও বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
গত সপ্তাহে ইয়েমেনজুড়ে হুথিদের অবস্থানে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি যুদ্ধবিমান। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ঠেকানোই এসব হামলার লক্ষ্য। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে অগ্রগতি অর্জন করেছে হুথিরা। ইয়েমেনের এই সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে আসছে রিয়াদ।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইয়েমেন সরকারের কাছ থেকে রাজধানী সানা দখলের পর থেকে হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
গোষ্ঠীটি এখন ইসরাইলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনার মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালাতে সক্ষম তারা।
হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডার কতটা উন্নত, তাদের হামলার কৌশল কীভাবে বদলেছে এবং সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা কেন এসব হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে—তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডার কতটা শক্তিশালী?
রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় ঠিক কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপ শুরুর পর থেকে সৌদি আরবের দিকে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে হুথিরা।
ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরাইলের গণহত্যামূলক অভিযান শুরুর পর থেকে ইসরাইল এবং ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ রয়েছে—এমন জাহাজেও হামলা চালিয়েছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে হুথিরা বিভিন্ন গতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে। ইয়েমেনের স্থলযুদ্ধেও একই কৌশলের প্রতিফলন দেখা গেছে। গত মাসে দ্রুতগতির এক অভিযানে লোহিত সাগর উপকূল দখলের আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে সরকারি বাহিনীর অবস্থানে ব্যাপক হামলা চালায় গোষ্ঠীটি।
হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডারের অন্যতম উন্নত অস্ত্র হলো মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘প্যালেস্টাইন-২’। দুই ধাপে কাজ করা কঠিন জ্বালানিচালিত এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার বলে ধারণা করা হয়। এতে শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি গতিতে চলার সক্ষমতা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র হলো ‘তুফান’। এটিকে ইরানের ‘ঘাদর’ ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন নাম দেওয়া সংস্করণ বলে মনে করা হয়। এর পাল্লা ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ কিলোমিটারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়।
ক্লাস্টার ওয়ারহেড বহনে সক্ষম এসব ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার কারণে ইয়েমেন থেকে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতেও সক্ষম হয়েছে হুথিরা।
এ ছাড়া ‘বুরকান’ ও ‘বদর’ সিরিজের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে গোষ্ঠীটির হাতে। এগুলোও ইরানি উৎস থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে হামলায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে হুথিরা।
কিংস কলেজের যুদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষক নওয়াফ ওবাইদের মতে, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডারের মূল ভিত্তি ইরানি অস্ত্র-প্রযুক্তি। এতে চীনা প্রযুক্তিরও কিছু প্রভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নিজস্ব প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবনের খুব বেশি প্রমাণ হুথিরা দেখাতে পারেনি। তাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা মূলত অপেক্ষাকৃত কম উন্নত কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।’
গত মাসে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী অভিযোগ করে, হুথিদের নতুন এক ধরনের সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এই সক্ষমতা হলো—লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় আকাশে ঘোরাফেরা করতে সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার।
সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা কেন হিমশিম খাচ্ছে?
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, গত সপ্তাহে তাদের বাহিনী বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার রাজধানী লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। তবে শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আঘাত হানা অস্ত্রটি ঠেকাতে পারেনি দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
আলজাজিরাকে নওয়াফ ওবাইদ বলেন, সৌদি আরবের বিশাল আয়তন এবং ইয়েমেনের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্তের কারণে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে মাঝেমধ্যে হামলা সফল হওয়াটা অপ্রত্যাশিত নয়।
তিনি বলেন, ‘বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিরক্ষা ভেদ করে চলে আসতে পারে।’ তবে তার মতে, হুথিদের প্রতিটি সফল হামলার বিপরীতে তাদের ছোড়া আরও বহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হয়।
নিরাপত্তানীতি ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাই আলজাজিরাকে বলেন, সৌদি আরবের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরান থেকে আসা হুমকি মোকাবিলা করা।
তবে হুথিদের হামলা বাড়তে থাকায় সৌদি আরব ইয়েমেনের দিক থেকে আসা হুমকি মোকাবিলায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশ নতুনভাবে মোতায়েন করছে বলে মনে করেন তিনি।
এ ছাড়া প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মিত্রদের মতো সৌদি আরবও ‘প্যাট্রিয়ট’ ও ‘থাড’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুত নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দ্রুত এসব ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশ ব্যবহার করে ফেলে।
গত মাসে হুথিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা অন্যান্য সহায়তা পাঠানোর জন্য কয়েকটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়।
হুথিদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
তবে হুথিরাও বেশ কিছু গুরুতর সীমাবদ্ধতার মধ্যে যুদ্ধ করছে। জাতিসংঘের আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, সৌদি আরবের দীর্ঘ দিনের অবরোধ এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন রণাঙ্গনে একযোগে লড়াই চালানোর কারণে তাদের ওপর চাপ রয়েছে।
নওয়াফ ওবাইদ বলেন, ‘সামরিক দিক থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে থাকলেও সৌদি আরবে মাঝেমধ্যে হামলা চালিয়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে জায়গা করে নিতে পারে হুথিরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ এবং জি-২০-এর সদস্য অর্থনীতি হিসেবে সৌদি আরবের বৈশ্বিক দায়িত্ব রয়েছে। এ কারণে দেশটির ওপর চালানো এ ধরনের হামলা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।’
হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ঠিক কত, তা জানা যায়নি। ফলে সৌদি আরবে হামলা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ইয়েমেনে তীব্র স্থলযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তাদের হাতে রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ওবাইদের মতে, ইয়েমেনে সৌদি আরবের বিমান অভিযানের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা এবং ড্রোন উৎপাদনকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা। এসব হামলায় গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতার ‘ব্যাপক ক্ষতি’ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
উলফগ্যাং পুস্তাইয়ের ধারণা, হুথিদের হাতে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা সম্ভবত এখন সীমিত হয়ে এসেছে।
এর অর্থ হলো, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলার মতো ব্যাপক হামলা চালানোর সক্ষমতা তাদের না-ও থাকতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে হুথিরা তুলনামূলক কম সুরক্ষিত বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে একক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কৌশল বেছে নিতে পারে। পুস্তাইয়ের মতে, এ ধরনের হামলার লক্ষ্য হবে সর্বোচ্চ কৌশলগত প্রভাব তৈরি করা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যাহত করা।