বাংলাদেশের দুর্গাপুজো মানেই বলা হয় অশান্তি আর উদ্বেগের খবর। তবে এবারের পুজোর বেশ কিছু ছবি যেন সেই ধারণার বাইরে গিয়ে তুলে ধরেছে এক অন্য বাংলাদেশকে। ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ি রোড থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পুজোমণ্ডপ- উৎসবের আনন্দে হিন্দু-মুসলিমের একসঙ্গে শামিল হওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা পেরিয়ে মানুষের মিলন, সহযোগিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এই ছবি নজর কেড়েছে অনেকের।
দুর্গাপুজো বাঙালির অন্যতম বড় উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে আনন্দ, আয়োজন ও আবেগের পাশাপাশি রয়েছে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার সুযোগ। বাংলাদেশের বিভিন্ন মণ্ডপে পুজো উপলক্ষে মানুষের উপস্থিতি, আয়োজনে সহযোগিতা এবং প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়ানোর দৃশ্য সেই বন্ধনের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। কোথাও উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছেন ভিন্ন ধর্মের মানুষ, কোথাও আবার পারস্পরিক সহযোগিতায় সুন্দর হয়ে উঠছে পুজোর পরিবেশ। এসব দৃশ্যের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠছে সহাবস্থানের এক ইতিবাচক বার্তা।
বিশেষ করে ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ি রোডের পুজোকে ঘিরে প্রকাশিত ছবি ও পোস্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ছড়িয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কবি অংশুমান কর তার ফেসবুক পোস্টে বাংলাদেশের পুজোর এই চিত্রকে ‘উলটপুরাণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তার বক্তব্যে উঠে এসেছে, অশান্তির খবরের বাইরে গিয়ে এবারের পুজোয় সম্প্রীতি ও ঐক্যের ছবিও গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। তার এই মন্তব্যের পর অনেকেই বাংলাদেশের উৎসবের পরিবেশের প্রশংসা করেছেন। কেউ লিখেছেন, ‘সম্প্রীতির বন্ধন’, আবার কেউ বলেছেন, ‘এটাই প্রকৃত উৎসবের আয়োজন, যেখানে ধর্মের বিভাজন নয়, মানুষের মিলনই বড় হয়ে ওঠে।’
অংশুমান কর তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “এই ছবি ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ি রোডের। বাংলাদেশে এবার বড় ভালো দুর্গাপুজো হয়েছে। অশান্তির খবর প্রায় নেইই। উৎসবে মেতেছে হিন্দু-মুসলমান সকলে। বেশ কিছু ভিডিওতে দেখলাম, সিঁদুর মেখে দশমীর দিন মণ্ডপ আলো করে দাঁড়িয়ে রয়েছে মুসলিম মেয়েরা। সরকারি ছুটি দেওয়া হয়েছে পাঁচ দিন। এগিয়ে চলো বাংলাদেশ। এটাই পথ। অন্তত এবারের দুর্গাপুজোয় আমরা বিভাজনকে প্রশ্রয় দিয়েছি আর ওরা ঐক্যকে।”
এই ছবি ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ি রোডের। বাংলাদেশে এবার বড় ভালো দুর্গাপুজো হয়েছে। অশান্তির খবর প্রায় নেইই। উৎসবে মেতেছে হিন্দু-মুসলমান সকলে। বেশ কিছু ভিডিওতে দেখলাম, সিঁদুর মেখে দশমীর দিন মণ্ডপ আলো করে দাঁড়িয়ে রয়েছে মুসলিম মেয়েরা। সরকারি ছুটি দেওয়া হয়েছে পাঁচ দিন। এগিয়ে চলো বাংলাদেশ।
সেই পোস্টের নিচে বাংলাদেশের পুজো নিয়ে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথাও ভাগ করে নিয়েছেন অনেকে। সন্দীপ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, প্রবাসী বাংলাদেশি হিন্দু পরিবারগুলোর কাছ থেকে তিনি পুজোর আয়োজন সম্পর্কে ভালো অভিজ্ঞতার কথা শুনেছেন। তাদের অনেকেই অস্ট্রেলিয়ায় দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন এবং উৎসবের সময় ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে গিয়ে পুজো উপভোগ করে আবার কর্মস্থলে ফিরে যান। তার এই অভিজ্ঞতার বর্ণনাও আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক সন্তোষ শর্মা সদ্যসমাপ্ত দুর্গাপুজো প্রসঙ্গে বলেন, এবারের পুজো শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপিত হয়েছে। পুজোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
তার মতে, এবারের পুজো ছিল অন্য মাত্রার। সারা দেশে বিরাজ করেছে উৎসবের আমেজ, পাশাপাশি সামগ্রিক পরিবেশও ছিল আগের তুলনায় অনেক ভালো। সফলভাবে দুর্গোৎসব সম্পন্ন হওয়ায় তিনি সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ধন্যবাদ জানান।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেছেন, এবারের দুর্গাপূজায় রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তারা ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’- এই অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বার্তা তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সম্প্রীতির বার্তা প্রদানকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
এবারের দুর্গাপূজায় রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তারা ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’- এই অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বার্তা তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সম্প্রীতির বার্তা প্রদানকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি সব ধর্মের মানুষের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখার আহ্বান জানান। তার মতে, সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি অসাম্প্রদায়িক, সম্প্রীতিপূর্ণ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
ময়মনসিংহ পূজা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শংকর সাহা রাইজিংবিডিকে বলেন, এবারের পুজো ছিল বেশ আনন্দঘন। পুজোর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবাই তাদের পাশে ছিলেন এবং সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। সবার আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের কারণে তারা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এবারের পুজো সম্পন্ন করতে পেরেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এবারের পুজো ছিল সর্বজনীন। এতে সবার অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ এবারের পুজোর আনন্দে শামিল হয়েছেন। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তাদের মুগ্ধ করেছে।
তিনি আরো বলেন, তারা এমন একটি পরিবেশই চান, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে উৎসবে অংশ নেবেন, আনন্দ ভাগাভাগি করবেন এবং সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করবেন। তারা চান, এভাবেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় থাকুক। এবারের পুজোয় যে সম্প্রীতি ও আনন্দঘন পরিবেশ দেখা গেছে, তা তাদের প্রত্যাশাকে আরো দৃঢ় করেছে।
এ ছাড়াও ঢাকা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাভার পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বরুন ভোমিক নয়ন রাইজিংবিডিকে বলেন, এবারের দুর্গোৎসব স্বতঃস্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। থানার পাশে বংশী নদীর তীরে অবস্থিত প্রতিমা বিসর্জনঘাটে হাজারো ভক্তের উপস্থিতিতে ৩০টিরও বেশি প্রতিমা একযোগে বিসর্জন দেওয়া হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাভারের ইতিহাসে এটি ছিল প্রথম ঘটনা।
