মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। গতকাল শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বা ৩ ডলার ৫৫ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ৭২ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বা ৩ ডলার ৮০ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলার ২৭ সেন্ট হয়েছে। গত ২৯ এপ্রিলের পর ব্রেন্টের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সপ্তাহের হিসাবে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
তেলের দাম বাড়ার প্রধান কারণ সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা। এসব হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ও তেল সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর এবং হরমুজ প্রণালিসহ আশপাশের জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। এলপিএল ফিন্যান্সিয়ালের প্রধান ক্রস-অ্যাসেট কৌশলবিদ অ্যাডাম টার্নকুইস্ট বলেন, সৌদি আরবে জ্বালানি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন স্থানে হুতিদের হামলার পর সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাই তেলের দাম বাড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো দেশটির ধাহরানে অবস্থিত প্রধান কার্যালয় থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্ম আল কুয়াইন উপকূলে একটি তেলবাহী জাহাজ থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর জানিয়েছে দেশটির জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়। তবে এ ঘটনার কারণ কিংবা সংশ্লিষ্ট জাহাজের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। গত ৯ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল জাজিরা এলাকার পশ্চিমে ‘জেম নম্বর ২’ নামের একটি সুপারট্যাংকার অজ্ঞাত বস্তু বা অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে সামুদ্রিক পরিবহনসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংঘাতের ঝুঁকি। লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু লিপো বলেন, গত সপ্তাহে তেলবাহী জাহাজে হামলার আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বাড়লেও পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা সম্ভব, তবে সংঘাত ধীরে ধীরে প্রশমিত হতে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সরবরাহসংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত থেকে সর্বোচ্চ চার লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিনিময়ের অনুমোদন দিয়েছে। লুইজিয়ানার লেক চার্লস শোধনাগারে সরবরাহ বিঘ্নের প্রভাব মোকাবিলায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ায় দেশটির কৌশলগত তেলের মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এদিকে জার্মানিও কৌশলগত মজুত থেকে ডিজেল, হিটিং অয়েল ও অপরিশোধিত তেল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। অক্টোবরের শুরুতে জি-৭ দেশগুলোর মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্তের পর এটিই জার্মানির প্রথম এমন পদক্ষেপ।
অন্যদিকে লিবিয়ার হামাদা ও তাহারা তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরে তেল পরিবহনের একটি পাইপলাইনের ভালভ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে দেশটির জাতীয় তেল করপোরেশনের প্রধান রয়টার্সকে জানিয়েছেন। এতে ওই দুই তেলক্ষেত্রে উৎপাদন কমেছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
