ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। ড. ইউনূসকে হেনস্তার চেষ্টার বিষয়টি তিনি সকালেই জেনেছেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ড. ইউনূস রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, সেই কারণেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এমন মন্তব্য করেন ডা. জাহেদ উর রহমান। এ সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা, শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন ও ভারত থেকে প্রত্যর্পণ, ড. ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগ, দিল্লিতে বিমসটেকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং পুলিশের মনোবল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘ড. ইউনূস ও তার অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে যৌক্তিক সমালোচনা করার অধিকার সবার রয়েছে। বর্তমান সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও অতীতে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তবে সমালোচনা করা এবং কাউকে প্রকাশ্যে হেনস্তা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করা এক বিষয় নয়।’
তার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রতি একধরনের প্রতিশোধপরায়ণতা থেকেই এসব কর্মকাণ্ড ঘটছে। শুধু ড. ইউনূস নন, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও একই ধরনের আচরণের চেষ্টা হয়েছে বলে তিনি জানান। একইভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তি এবং জুলাই আন্দোলনের ছাত্র সমন্বয়কদের কেউ কেউ এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন উপদেষ্টা।
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘এটা একেবারে স্পষ্টতই একটা সহিংসতা।’ বিদেশের আইনগত পরিবেশের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হয়তো আরও বেশি সহিংস হয়ে উঠতে পারছেন না, কিন্তু তাদের মধ্যে সেই প্রবণতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশকারী একজন অভিনেত্রীকে বিদেশে হেনস্তার ঘটনার কথাও তুলে ধরেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘ওই অভিনেত্রী শুধু জুলাই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। সেই কারণে তাকেও বিরূপ আচরণ ও হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে।’ এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘আওয়ামী সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনা সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। সংশ্লিষ্ট ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।’
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘ওই অভিনেত্রীকে হেনস্তার পর শুরু হওয়া আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টি তার জানা রয়েছে।’ তিনি বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, তারা যদি ভবিষ্যতেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করেন, তাহলে তা বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া হবে না। এসব ঘটনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রশ্নে সরকারের কোনো ঘাটতি থাকলে সেটিও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
ড. ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগের ঘটনায় এক সাংবাদিক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি জানতে চান, আগের সরকারের আমলে এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতো। তাহলে বর্তমান ঘটনার মূল্যায়ন কীভাবে করা হচ্ছে?
জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রেস সচিব অতীতে কোনো ঘটনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তার জবাব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই দিতে পারবেন।’ তিনি অন্য কারও দেওয়া ব্যাখ্যার পক্ষে বা বিপক্ষে মন্তব্য করতে চান না। তবে বর্তমান ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে জুলাই আন্দোলন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ আচরণের ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, অতীতের কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে বর্তমানে সংঘটিত হেনস্তা কিংবা সহিংস আচরণকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই।
ড. ইউনূসসহ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হেনস্তার ঘটনায় দেশের কিছু গণমাধ্যমের সংবাদ উপস্থাপন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে ব্রিফিংয়ে। এক সাংবাদিক অভিযোগ করেন, ‘কোনো কোনো গণমাধ্যম এমনভাবে এসব ঘটনার সংবাদ প্রকাশ করে, যাতে মনে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হেনস্তার যোগ্য ছিলেন।’
এ বিষয়ে সরকারের নজরদারি রয়েছে কি না? জানতে চাইলে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘গণমাধ্যমে এ ধরনের সংবাদ উপস্থাপনের প্রবণতা সরকারের নজরে রয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যেও এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করা পড়ে।’ তবে গণমাধ্যমের কোনও প্রতিবেদন বা ব্যাখ্যা পছন্দ না হলেই সরকারের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন আসে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রতিটি গণমাধ্যমেরই কোনো ঘটনাকে নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে। সেই স্বাধীনতাকে বিবেচনায় নিতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোনো ঘটনা নিয়ে অযৌক্তিক বা উদ্ভট ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হলে সেটি শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। তবে সংবাদ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কেউ আইনি সীমা লঙ্ঘন করলে এবং তাতে কোনও ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইনগত প্রতিকার চাইতে পারবেন।’ তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য দেশের বিচারব্যবস্থা রয়েছে।
