মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা এবং দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নতুন ঋণ সহায়তা নিতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগের ঋণ কর্মসূচি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে আসার পর এবার নতুন করে ঋণ নিতে চাইছে সরকার। এ নিয়ে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে চলছে শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পেতে পারে। তিন বছর মেয়াদি এই ঋণ চুক্তি আগামী ডিসেম্বরে সই হতে পারে। এ লক্ষ্যে নতুন কর্মসূচির খসড়া ও রোডম্যাপ নির্ধারণে আইএমএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন অর্থমন্ত্রী।
তবে নতুন ঋণের ক্ষেত্রে আগের কর্মসূচির শর্তগুলোই আবার সামনে আসছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। ফলে ঋণ পাওয়ার পাশাপাশি সংস্কার কর্মসূচির বাস্তবায়ন, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়েও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হচ্ছে সরকারকে।
নতুন ঋণে যেসব শর্ত সামনে আনছে আইএমএফ
আগের ঋণ কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশের বেরিয়ে আসার পর নতুন ঋণ আলোচনায় কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছে আইএমএফ। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আগের কর্মসূচিতে থাকা বেশ কয়েকটি সংস্কার শর্ত নতুন ঋণের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, জ্বালানি ও কৃষি খাতে ভর্তুকি কমানো এবং সরকারি পরিসংখ্যানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সংস্কারের অনেকগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হোক বা না হোক, সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সংস্কার ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, সংস্কার কর্মসূচিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে দেশের নীতিনির্ধারকদের নিজস্ব উপলব্ধি থাকা জরুরি।
তাঁর মতে, আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার আগে মনে রাখতে হবে, এটি অনুদান নয়। ঋণের আসল অর্থের পাশাপাশি সুদও পরিশোধ করতে হবে। ফলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরিতে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি করা গেলে ঋণ পরিশোধের দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না পৌঁছালে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। এ কারণে নতুন ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‘নতুন বোতলে পুরোনো শরবত’ হওয়ার আশঙ্কা
নতুন ঋণ কর্মসূচির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তাঁর মতে, আগের কর্মসূচিকে কঠিন শর্তযুক্ত বলা হলেও কোন শর্তগুলো কঠিন, তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, শর্তগুলো স্পষ্ট না হলে নতুন কর্মসূচি কার্যত আগের কর্মসূচির পুনরাবৃত্তি হয়ে উঠতে পারে। এতে সংস্কার কার্যক্রমের সময়সীমা আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ড. জাহিদ হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, আগের কর্মসূচির আওতায় যেসব কাজ আগামী বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল, মাঝখানে বিরতি আসায় সেগুলো বাস্তবায়নে আরও দুই বছর পর্যন্ত দেরি হতে পারে। তাই পুরোনো কর্মসূচির অসমাপ্ত কাজগুলো কীভাবে নতুন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সেটিও পরিষ্কার করা দরকার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ কর্মসূচির শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
আগের ঋণ চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ
এর আগে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার ছাড় করতে পেরেছিল। তবে বিভিন্ন শর্ত পূরণে জটিলতা তৈরি হওয়ায় চলতি মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে ওই কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসে বাংলাদেশ।
এখন নতুন করে ঋণ আলোচনায় বসায় আগের কর্মসূচির অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কোন সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, কেন শর্ত পূরণে জটিলতা তৈরি হয়েছিল এবং নতুন কর্মসূচিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে—এসব বিষয় আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন ঋণ চুক্তি হলে বাংলাদেশ একদিকে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন ও ঋণ পরিশোধের দায়িত্বও নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন ঋণ আলোচনা এখন অর্থায়নের পাশাপাশি সংস্কারের শর্ত নির্ধারণের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ। ডিসেম্বরে সম্ভাব্য চুক্তির আগে শর্তগুলো কতটা বাস্তবসম্মত হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তার ওপরই আলোচনার পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করবে।
The post আইএমএফের নতুন ঋণের শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি appeared first on SATV.
