প্রেসিডেন্সি জেলেই দুর্গাপুজো করেন নেতাজি (প্রতীকী ছবি)গ্রাফিক্স: রুশিতা বোস দত্ত
Published on
:
2 min read
জেলের ভিতরে ঢাক বাজছে — তাক ডুম ডুম, তাক ডুম ডুম...। পাশেই নাচতে নাচতে কাঁসর বাজাচ্ছেন এক কয়েদি। ইউরোপিয়ান ব্লকের মাঠে তিলধারণের জায়গা নেই। লাল চোখে দোতলার অফিসের সামনে থেকে দেখছেন জেলার মেজর পাটনি। জেলের ভিতরে দুর্গাপুজো? স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না তিনি। কিন্তু সেটাই করছেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।
ডালহৌসি স্কোয়্যারের কাছে সেন্ট জনস চার্চের বাগানের এককোণে রয়েছে দ্বিতীয় হলওয়েল মনুমেন্ট। সিরাজউদ্দৌল্লার আক্রমণে নিহত ইংরেজ সেনার স্মৃতিতে তৈরি সেই স্মৃতিসৌধ সরানোর দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন নেতাজি। ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় প্রেসিডেন্সি জেলে — সেটা ১৯৪০ সালের জুলাই মাস। মাস দু’য়েক পরেই শুরু করলেন আন্দোলন। জেলে দুর্গাপুজো করতে দিতে হবে।
প্রেসিডেন্সি জেল কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখলেন সুভাষ। কিন্তু ইংরেজরা রাজি নন। জেলের ভিতরে ঢাক-ঢোল-ঘণ্টা বাজবে? তা আবার হয় নাকি! নেতাজির সঙ্গেই ছিলেন বিপ্লবী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী। ‘নেতাজি সঙ্গ ও প্রসঙ্গ’ বইয়ে সেই ঘটনার কথা বিস্তারিত লিখেছেন তিনি। সেখান থেকে জানা যাচ্ছে, দুর্গাপুজো নিয়ে আলোচনা করতে নেতাজির সেলে এসেছেন জেলার পাটনি।
নেতাজি তাঁকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ঢাক ঢোল বাজবে। কেউ আটকাতে পারবে না। পাটনির চোখে চোখ রেখে তিনি বলেন, ‘সব হিন্দুকে পুজোয় অংশ নেওয়ার অনুমতি নিতে হবে।... যাদের ইচ্ছা হবে অঞ্জলি দেবে। প্রসাদ নেবে। আরতি দেখবে।’ কিন্তু পাটনির আপত্তি ঢাক বাজানোয়। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, ‘জেলের মধ্যে গোটা পাঁচেক ঢাক যদি একসঙ্গে বেজে ওঠে, সে তো ভয়ানক ব্যাপার...।’
ঘণ্টাতেও আপত্তি পাটনির। ঘণ্টা বললে তাঁর পাগলা ঘণ্টির কথা মনে আসে। পাটনির কথায়, ‘মারাত্মক ফ্যাসাদ বেঁধে যাবে।’ নেতাজি ছাড়বেন না। পুজো হবে, ঢাকও বাজবে। সাফ জানিয়ে দেন তিনি। বিরসবদনে ফিরে যান পাটনি। কিন্তু তার পরেও অনুমতি মেলে না। এই পরিস্থিতিতে (১৯৪০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর) জেলের সুপারিন্টেন্ডেন্টকে একটি দীর্ঘ চিঠি লিখলেন সুভাষ। তার ছত্রে ছত্রে ধিক্কার, বিদ্রুপ আর ব্যঙ্গ।
চিঠিতে অনমনীয় সুভাষ জানিয়ে দিলেন, জেলে পঞ্জিকা মেনেই দুর্গাপুজো হবে। ঢাক, ঢোল কাঁসরও বাজবে। যা যা দরকার, সব হবে। তার জন্য অনুমতিও দিতে হবে কর্তৃপক্ষকে। সেই পত্রাঘাত আর সামলাতে পারেনি ব্রিটিশ সরকার। অনুমতি মেলে। ধুমধাম করে পুজো হয় প্রেসিডেন্সি জেলে।
সপ্তমীর দিন স্নান করে ধুতি আর মটকার চাদর আর ছোট গরদের কাপড়কে পিন দিয়ে আটকে নেতাজির দুই কাঁধের উপর দিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন বিপ্লবী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী। সে দিন তাঁর সেলে কেউ শিউলি ফুল রেখে গিয়েছিলেন। কে? আজ আর সেই তথ্য জানা যায় না। সেই ফুল দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন নেতাজি। বলেছিলেন, ‘অতসীপুষ্পবর্ণাভা, দেবীর রূপ।’
‘মাতৃসাধক সুভাষচন্দ্র: স্মরণে-মননে সুভাষচন্দ্র’ বইয়ে সে দিনের কথা লিখেছেন বিনয়-বাদল দীনেশের সহ-বিপ্লবী রসময় শূর। বিপ্লবী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী আর তাঁকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে দুর্গাঠাকুরের সামনে হাজির হয়েছিলেন সুভাষ। তন্ত্রধারক তখন চণ্ডীপাঠ করছেন, ‘দুবৃত্তবৃত্তশমনং তব দেবী শীলং/ রূপং তথৈতদবিচিন্ত্যমনমতুল্যমন্যৈঃ...।’ রসময় লিখছেন, ‘তাঁর কাছে নস্যির ডিবের মতো ছোট চণ্ডী ছিল। সেটা খুলে বসলেন তিনি। গম্ভীর মুখ, কোনও ভাবান্তর নেই।’
অষ্টমীর দিন সব কয়েদি একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছিল। প্রসাদ দেওয়া হয়েছিল সবাইকে। রসময় লিখেছেন, ‘প্রসাদ দেওয়া হলো সবাইকে। যে এল তাকেই। মায় চিনাদেরও। এক সঙ্গে খাওয়া হলো।’ নেতাজির এই রূপ তিনি আর দেখেননি। তাঁর কথায়, ‘ভক্তি শ্রদ্ধা উপচে পড়ছে চোখে-মুখে। কখনও পুজোর তদারক করছেন। সমাহিত চিত্তে মা’কে দেখছেন।’
তবে দুর্গাপুজোর মধ্যেও নিজের লক্ষ্য ভোলেননি নেতাজি। সদা-সতর্ক কারা কর্তৃপক্ষের শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে তিনি নিজের কাজ করে গিয়েছেন। ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের দাবি, আসলে দুর্গাপুজোর মধ্যে দিয়ে কয়েদিদের একজোট করতে চেয়েছিলেন তিনি। জেলের দেওয়াল যতই উঁচু হোক, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে বন্দি করা যায় না — প্রেসিডেন্সি জেলের সেই দুর্গাপুজো যেন মনে করিয়ে দিয়েছিল এই কথাই।
