দেশের মানুষের গড় আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। এতে ঋণ নিয়ে সংসার পরিচালনা করছে বহু পরিবার। দেশের ঋণগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা এখন ৪৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। গ্রামে এই হার আরও বেশি। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাপন করছেন–যা দারিদ্র বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
ছুটির এক সকালে বাজারে ঘুরছিলেন ব্যাংকার আনিসুর রহমান। সব পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে হতাশা তার। জানান, মাস ফুরোনোর আগেই তার বেতন ফুরিয়ে যায়। বাসাভাড়া আর সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে প্রতি মাসেই তাকে ঋণ নিতে হয়। ‘এভাবে একটু একটু করে ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছি।’
শরীয়তপুরের কৃষক সেলিম রহমান বলেন, ‘জমি তৈরির মূলধন জোগাড় করতে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিই। সেই ঋণে সুদ জমে জমে এখন তা পাহাড়সম হয়েছে। ঋণের বোঝা কমাতে না পারায় বাড়িতে নিয়মিত হেনস্তা হতে হয় পরিবারকে।’
একইরকম অবস্থার কথা জানিয়েছেন কোনো সরকারি চাকুরিজীবীও। একদফা বেতন বাড়ার পরও খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তারা। নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছেন না বলেও দাবি তাদের।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ
বিবিএসের ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ অনুযায়ী, দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে গত এক বছরে গ্রামের ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার ঋণ করেছে। শহরাঞ্চলে এই হার ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ।
জরিপে দেখা গেছে, জাতীয় পর্যায়ে পরিবারপ্রতি গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। এর বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২ হাজার টাকা ঘাটতি।
২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে গড় পারিবারিক আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা, আর ব্যয় ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। তখন আয় ব্যয়ের চেয়ে প্রায় ৯২২ টাকা বেশি ছিল।
এবার সেই চিত্র উল্টে গেছে। আগের জরিপের তুলনায় গড় আয় বেড়েছে মাত্র ১ হাজার ৯১ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে ব্যয় বেড়েছে ৩ হাজার ৮১১ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ১২ শতাংশ।
এবার এলাকাভেদে গড় মাসিক ব্যয় সিটি করপোরেশনে ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা, শহরাঞ্চলে ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামে ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা।
জাতীয়ভাবে মাসিক খরচের অর্ধেক যায় খাদ্যে, বাকি অর্ধেক খাদ্যবহির্ভূত খাতে। গ্রামে খাদ্যের পেছনে খরচ বেশি। সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ খরচ হয় খাদ্যবহির্ভূত খাতে।
মজুরির চিত্রও একই। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে, আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। একই মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
জাতীয় বেতন কমিশনের অনুরোধে নবম জাতীয় বেতন স্কেলের সুপারিশ তৈরিতে সহায়তার জন্য জরিপটি করা হয়। গত বছরের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর ১৫০টি নমুনা এলাকার তিন হাজার পরিবারের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।
অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আয় না বাড়লেও খরচ বাড়ছে, ফলে অনেক পরিবারের ঋণ নেওওয়া ছাড়া উপায় থাকছে না।
তার মতে, এ অবস্থায় দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে। সঙ্গে নিয়মিত পরিচালনা করতে হবে টিসিবি ট্রাকসেল কার্যক্রম।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস
গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে বলা হয়েছে, শ্রমের চাহিদায় ঘাটতি ও টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
