হাকালুকি হাওর—প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা এক অনন্য জলাভূমি।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হাকালুকি হাওর। বিস্তীর্ণ জলরাশি, মৌসুমি জলাবদ্ধ ভূমি, জলজ উদ্ভিদ, মাছ এবং নানা ধরনের পাখির আবাসস্থল হিসেবে এই হাওর বিশেষ পরিচিত। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এই জলাভূমি বাংলাদেশের হাওরভিত্তিক প্রকৃতি ও পরিবেশব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
হাকালুকি হাওরের সৌন্দর্য শুধু বর্ষাকালের বিস্তীর্ণ পানির দৃশ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর জলরাশি, তীরবর্তী ভূমি, উদ্ভিদরাজি ও জীবজগতের চেহারাও বদলে যায়। বর্ষায় বিস্তৃত পানির আবরণ তৈরি হয়, আর শুষ্ক মৌসুমে হাওরের কিছু অংশে জলাভূমির ভিন্ন রূপ প্রকাশ পায়। এই পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্য হাকালুকিকে একটি গতিশীল প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশের জলাভূমিগুলো মাছের প্রজনন, জলজ জীবের আবাসস্থল এবং পাখির খাদ্যসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হাকালুকি হাওরও এ ধরনের পরিবেশগত ভূমিকার কারণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাই একে শুধু একটি বিস্তৃত জলরাশি হিসেবে নয়, বরং বহু জীবের পারস্পরিক নির্ভরতার একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
হাকালুকি হাওরের ভৌগোলিক পরিচয়
হাকালুকি হাওর বাংলাদেশের বৃহত্তম হাওর হিসেবে পরিচিত। এটি মূলত মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত হলেও এর বিস্তৃতি সিলেট জেলার কয়েকটি উপজেলাতেও ছড়িয়ে রয়েছে। বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার পাশাপাশি সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার সঙ্গে এই জলাভূমির ভৌগোলিক সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাদুপানির জলাভূমিগুলোর মধ্যে হাকালুকি হাওরের বিশেষ অবস্থান রয়েছে। এর বিস্তীর্ণ জলাভূমি, সংযুক্ত বিল এবং মৌসুমি পানির প্রবাহ মিলে একটি জটিল জলাভূমি ব্যবস্থা তৈরি করেছে। সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, হাওরটির মোট আয়তন প্রায় ১৮১.১৫ বর্গকিলোমিটার। তবে পানির বিস্তার ও জলমগ্ন এলাকার পরিমাণ ঋতু অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
হাকালুকি হাওরের চারপাশের ভূমি, নদী এবং জলপ্রবাহ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। বর্ষাকালে বিভিন্ন বিল ও নিম্নাঞ্চল পানিতে একাকার হয়ে বিস্তৃত জলরাশির সৃষ্টি করে। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে এলে আলাদা বিল, জলাভূমি ও উন্মুক্ত ভূমির বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উৎস: মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন—হাকালুকি হাওর
বিল, নদী ও মৌসুমি জলরাশির বৈচিত্র্য
হাকালুকি হাওরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য ছোট-বড় বিল। কিছু বিল সারা বছর পানি ধরে রাখে, আবার কিছু বিল মূলত বর্ষাকালে পানিতে পূর্ণ হয়। এই পার্থক্য হাওরের পরিবেশকে ঋতুভেদে ভিন্ন রূপ দেয়।
বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বৃষ্টিপাত, নদীর প্রবাহ এবং আশপাশের উঁচু ভূমি থেকে নেমে আসা পানির সম্মিলিত প্রভাবে জলাভূমির বিস্তার পরিবর্তিত হয়। হাকালুকি হাওরেও এই প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষায় বিস্তৃত পানির কারণে বিলগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, আর শুষ্ক মৌসুমে সেগুলো আবার পৃথক জলাশয়ের রূপ নেয়।
হাওরের জলপ্রবাহের সঙ্গে জুড়ী, সোনাই-বড়দল, ফানাইসহ বিভিন্ন নদী ও জলপথের সম্পর্ক রয়েছে। এসব জলধারা পানি ও পলি পরিবহনের পাশাপাশি হাওরের সামগ্রিক জলবিদ্যাগত বৈশিষ্ট্য গঠনে ভূমিকা রাখে।
হাকালুকি হাওরের প্রকৃত সৌন্দর্য তাই কোনো এক ঋতুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পানির গভীরতা, জলজ উদ্ভিদের বিস্তার এবং উন্মুক্ত ভূমির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এখানে প্রকৃতির এক চলমান রূপান্তর দেখা যায়।
উৎস: IUCN Bangladesh—হাকালুকি হাওরের জলবিদ্যাগত বৈশিষ্ট্য

জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ ভান্ডার
হাকালুকি হাওর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলোর একটি, কারণ এটি বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল। জলজ উদ্ভিদ, মাছ, উভচর প্রাণী, সরীসৃপ, পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল একটি সমৃদ্ধ পরিবেশব্যবস্থার অংশ।
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের প্রকাশিত তথ্যে হাকালুকি হাওরের উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈচিত্র্য সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য সংখ্যার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, জলাভূমি নিয়ে সরকারি গবেষণাতেও হাকালুকির মতো হাওর অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যকে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত জরিপে প্রজাতির সংখ্যা ও তালিকা আলাদা হতে পারে। তাই পুরোনো জরিপের সংখ্যাকে বর্তমান অবস্থার নিশ্চিত চিত্র হিসেবে ধরা উচিত নয়।
জীববৈচিত্র্যের এই সমৃদ্ধি শুধু প্রজাতির সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায় না। প্রতিটি জীব তার পরিবেশে নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করে। জলজ উদ্ভিদ পানির পরিবেশে খাদ্য ও আশ্রয় সরবরাহ করতে পারে, মাছ খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আর পাখি বিভিন্ন জলজ ও স্থলজ প্রাণীর সংখ্যার ভারসাম্যে ভূমিকা রাখতে পারে।
হাকালুকি হাওরের জীবজগৎ রক্ষার জন্য তাই এর আবাসস্থলগুলোর বৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি। একটি বিলের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট অন্যান্য জীবের ওপরও পড়তে পারে।
উৎস: বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড—হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য
পরিযায়ী পাখির আশ্রয়স্থল
শীত মৌসুমে হাকালুকি হাওর বিভিন্ন ধরনের পাখির উপস্থিতির জন্য পরিচিত। জলাভূমির বিস্তৃতি, অগভীর পানির এলাকা এবং খাদ্যের প্রাপ্যতা অনেক জলচর পাখির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে। শীতকালে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা পরিযায়ী পাখিরাও বাংলাদেশের বিভিন্ন জলাভূমিতে আশ্রয় নেয়।
আরও পড়ুন: সিলেটের লালাখাল: নীল-সবুজ জলের অপূর্ব সৌন্দর্য
পাখির জন্য একটি জলাভূমির গুরুত্ব নির্ভর করে শুধু পানির উপস্থিতির ওপর নয়; খাদ্য, নিরাপদ বিশ্রামের জায়গা এবং উপযুক্ত প্রজনন বা আশ্রয়স্থলও গুরুত্বপূর্ণ। হাকালুকির বিভিন্ন বিল ও জলজ উদ্ভিদসমৃদ্ধ অঞ্চল পাখিদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
জলচর পাখি পরিবেশের পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। পানির গুণমান, খাদ্যের প্রাপ্যতা কিংবা মানুষের কার্যক্রমের কারণে তাদের উপস্থিতি ও বিচরণে পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে পাখির সংখ্যা ও প্রজাতি সম্পর্কে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জলাভূমির সামগ্রিক অবস্থা মূল্যায়নে সহায়ক।
পাখির আবাসস্থল রক্ষার জন্য তাদের বিশ্রাম ও খাদ্য সংগ্রহের এলাকায় অযথা বিরক্তি সৃষ্টি না করা জরুরি। বিশেষ করে সংবেদনশীল জলাভূমি অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল, পাখি শিকার এবং জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস তাদের স্বাভাবিক জীবনচক্রে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
উৎস: বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড—হাকালুকি হাওর ও পাখির বৈচিত্র্য
মাছ ও জলজ উদ্ভিদের পারস্পরিক সম্পর্ক
হাকালুকি হাওরের পরিবেশগত গুরুত্বের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মাছ ও জলজ উদ্ভিদ। হাওরের বিভিন্ন বিল মাছের খাদ্য, আশ্রয় এবং জীবনচক্রের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোর জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে জলজ উদ্ভিদ অনেক জলজ প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে এবং পানির পরিবেশে পুষ্টি উপাদানের চলাচলের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
জলাভূমিতে মাছের বৈচিত্র্য বজায় রাখতে পানির গভীরতা, প্রবাহ, অক্সিজেনের মাত্রা, প্রজননের উপযোগী স্থান এবং খাদ্যের প্রাপ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। ঋতুভেদে পানির পরিমাণ বদলে যাওয়ায় মাছের চলাচল ও বিস্তৃতিতেও পরিবর্তন ঘটতে পারে।
সরকারি জলাভূমি গবেষণায় হাকালুকি হাওরের মৎস্যসম্পদ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ও উঠে এসেছে। IUCN Bangladesh-এর ২০০৩ সালের গবেষণায় হাওরটির ৩২টি জাতীয়ভাবে বিপন্ন স্বাদুপানির মাছের প্রজাতির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এটি ঐতিহাসিক গবেষণার একটি তথ্য; বর্তমান সময়ে ওই প্রজাতিগুলোর অবস্থা নির্ধারণ করতে নতুন জরিপ প্রয়োজন।
মাছের আবাসস্থল রক্ষার জন্য প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, ক্ষতিকর জাল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং পানিদূষণ কমানো গুরুত্বপূর্ণ। জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস করা বা প্রাকৃতিক জলপ্রবাহে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করলেও মাছের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
উৎস: বাংলাদেশ সরকারের হাওর ও জলাভূমি ব্যবস্থাপনা গবেষণা
স্থানীয় মানুষের জীবন ও হাওরের সম্পর্ক
হাকালুকি হাওর আশপাশের জনপদের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। স্থানীয় মানুষের একটি অংশ মাছ ধরা, কৃষিকাজ এবং জলাভূমিনির্ভর বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। হাওরের পানি ও ভূমির মৌসুমি পরিবর্তন স্থানীয় অর্থনীতি এবং দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলে।
বর্ষাকালে জলরাশি বিস্তৃত হলে অনেক নিচু ভূমি পানিতে ডুবে যায়। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে এলে কিছু এলাকায় কৃষিকাজ ও অন্যান্য ভূমিভিত্তিক কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি হয়। এভাবে হাওরের ঋতুভিত্তিক পরিবর্তন স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে জলাভূমির সম্পদ ব্যবহার এবং সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। অতিরিক্ত মাছ আহরণ, জলাভূমি ভরাট কিংবা প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ধ্বংস হলে দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় মানুষের জীবনধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
হাওর ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পানির পরিবর্তন, মাছের উপস্থিতি এবং ঋতুভিত্তিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত। এই অভিজ্ঞতাকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও কার্যকর সংরক্ষণনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে জলাভূমির টেকসই ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হতে পারে।
হাকালুকি হাওরের পরিবেশগত গুরুত্ব
হাকালুকি হাওর একটি বিস্তৃত প্রাকৃতিক জলাধারব্যবস্থা। বর্ষার পানি ধারণ, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে এ ধরনের জলাভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রাকৃতিক জলাভূমি অনেক ক্ষেত্রে বন্যার পানি সাময়িকভাবে ধারণ করতে পারে। এর মাধ্যমে পানির প্রবাহ ও বিস্তারের ধরন প্রভাবিত হয়। তবে এই ভূমিকা নির্ভর করে জলাভূমির গভীরতা, সংযোগব্যবস্থা, মাটির বৈশিষ্ট্য এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর।
জলাভূমি পলি ও পুষ্টি উপাদানের চলাচলের সঙ্গেও সম্পর্কিত। জলজ উদ্ভিদ ও অণুজীব পানির পরিবেশে বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। একই সঙ্গে হাওর মাছ, পাখি এবং অন্যান্য জীবের জন্য খাদ্য ও আবাসস্থল সরবরাহ করে।
হাকালুকি হাওরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য তাই শুধু পানি রক্ষা করলেই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত বিল, নদী, জলজ উদ্ভিদ, মাছের প্রজননক্ষেত্র এবং পাখির আবাসস্থলকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পরিবেশগত সংকট ও সংরক্ষণের প্রয়োজন
হাকালুকি হাওরের মতো জলাভূমি বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত চাপের মুখে পড়তে পারে। অতিরিক্ত মাছ আহরণ, নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর জালের ব্যবহার, জলাভূমির প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ধ্বংস, বর্জ্য দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত মানবিক কার্যক্রম জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানায়, জলাভূমির পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় সরকার টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওরের জন্য সুরক্ষা আদেশ জারি করেছে। প্রতিবেদনে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও নৌযান চলাচল, অবৈধ বালু উত্তোলন, নিষিদ্ধ চীনা জাল ব্যবহার এবং জলজ বন ধ্বংসের মতো বিষয় নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ করা হয়।
এই পদক্ষেপ জলাভূমির সংবেদনশীল পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে। বিশেষ করে পাখির আবাসস্থল, মাছের প্রজননক্ষেত্র এবং জলজ উদ্ভিদসমৃদ্ধ এলাকায় ক্ষতিকর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
হাকালুকি হাওর সংরক্ষণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
-
অবৈধ ও ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করা।
-
জলজ বন ও স্থানীয় উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা।
-
পাখি শিকার এবং আবাসস্থল ধ্বংস বন্ধ করা।
-
নদী ও বিলের পানিদূষণ কমানো।
-
সংবেদনশীল এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা।
-
স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা।
-
নিয়মিত বৈজ্ঞানিক জরিপের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা।
উৎস: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা—হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর সুরক্ষা আদেশ, ১০ নভেম্বর ২০২৫
সিলেটের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যে হাকালুকি হাওরের অবস্থান
সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে পাহাড়, বনভূমি, নদী, চা-বাগান ও জলাভূমির বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে। হাকালুকি হাওর এই পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ এটি বাংলাদেশের বৃহৎ স্বাদুপানির জলাভূমি পরিবেশের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে।
এর বিস্তৃত জলরাশি, মৌসুমি পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্য উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে হাওরের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য বিলের পরিবেশ একে একক জলাশয়ের পরিবর্তে একটি বৃহত্তর জলাভূমি ব্যবস্থায় পরিণত করেছে।
হাকালুকি হাওরের গুরুত্ব জাতীয় সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জলাভূমি সংরক্ষণ, পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল রক্ষা এবং মিঠাপানির জীববৈচিত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিবেশের গুরুত্ব আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। হাকালুকির সংরক্ষণ তাই বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
উৎস: বাংলাদেশের মিঠাপানির জীববৈচিত্র্য পোর্টাল—হাওরসমূহ
উপসংহার: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জলাভূমি সংরক্ষণ
হাকালুকি হাওর বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলাভূমি। এর বিস্তৃত জলরাশি, অসংখ্য বিল, জলজ উদ্ভিদ, মাছ এবং পাখির বৈচিত্র্য একে উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের বিশেষ অংশে পরিণত করেছে। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর দৃশ্য ও পরিবেশের রূপ বদলে যায়, যা জলাভূমির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্ট করে।
তবে হাকালুকি হাওরের গুরুত্ব শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা এবং বৃহত্তর পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এর সংরক্ষণে প্রয়োজন দায়িত্বশীল সম্পদ ব্যবহার, কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত গবেষণা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ।
হাকালুকি হাওর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলাভূমি কেবল পানি জমে থাকা কোনো স্থান নয়; এটি অসংখ্য জীবের আশ্রয় এবং প্রকৃতির ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আসুন, হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতন হই, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই অনন্য জলাভূমির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে।
