মোহাম্মদ খোরশেদ হেলালী
কক্সবাজারের ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক এলাকায় বাঁশ – কাঠের তৈরি টুপটুপ রেস্টুরেন্টে এন্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরও ছয়জন আহত হয়েছেন। আগুনে রিসোর্টটি প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। মেরিন ড্রাইভ সড়ক ঘেঁষা কাঠ ও বাঁশের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে ছিলনা
অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স৷
ফ্রিজের শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সুত্রপাত বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন ওই রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ারসার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, দুপুর ১টা ৫০ পর্যন্ত রিসোর্ট থেকে অন্তত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজার স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, আজ সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে আগুনের খবর দেওয়া হয়। সকাল আটটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। চারজন ব্যক্তি মারা গেছেন তিনতলার দুটি শৌচাগারে।মোরশেদ বলেন, তীব্র বাতাসে কাঠের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কিন্তু রিসোর্টটিতে এগুলোর কিছুই ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। মাত্র সাত-আট মাস আগে রিসোর্টটি তৈরি হয়েছিল। জায়গাটির মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানান তিনি।নিহতদের মধ্যে রাজধানীর বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও ফায়িজান আহম্মেদ (৫) রয়েছেন।
অন্যদিকে আহতরা হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহত ছয়জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। তাদের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। অপর একজন পড়ে গিয়ে আহত হন। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে চারজনের শরীর এতটাই দগ্ধ হয়েছে যে, তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
আগুন থেকে বেঁচে ফেরা পর্যটক আব্দুল মান্নান বলেন, হঠাৎ দরজা খুলে দেখি ধোঁয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। তাৎক্ষণিক আমি ও আমার স্ত্রী পাশের নালায় লাফ দিয়ে বের হয়ে আসি। তিনি জানান, রিসোর্টটিতে ২৫ থেকে ৩০ জনের মতো পর্যটক থাকতে পারেন। ঢাকার মিরপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে এসে তাঁরা ওই রিসোর্টে উঠেছিলেন। সেখানে আরও দুই দিন থাকার কথা ছিল তাঁদের।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, রিসোর্টটি বাঁশ ও কাঠ দিয়ে ঘেরা ছিল। নিচতলায় ছিল রান্নাঘর এবং ওপরের অংশে ছিল পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। রিসোর্টটির কোনো অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। গত জুন মাসেও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সেই সতর্কতায় তারা কর্ণপাত করেনি। ধারণা করা হচ্ছে ফ্রিজ থেকে আগুনের সুত্রপাত।
ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, ঘটনাস্থল থেকে প্রথমে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার হয়। দুপুর ১ টার পর টয়লেট থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের শরীর এতোটা পুড়ে যায় যে, শনাক্ত করার মতো কোন অবস্থাই নেই। নিহতরা সবাই পর্যটক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
রিসোর্টের ইনচার্জ মো. সুমন জানান, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে তাঁরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন।
তিনি বলেন, ফ্রিজ থেকে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে আমরা নেভানোর চেষ্টা করি। ততক্ষণে রিসোর্টের এসি ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে পুরো রিসোর্টে আগুন ধরে যায়।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আকতার জানিয়েছেন, পরে উদ্ধার হওয়া ৪ জনের অবশিষ্টাংশ পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, প্রাথমিকভাবে রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ইতিমধ্যে ৬ মরদেহ শনাক্ত করেছেন এবং আহত ছয়জনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হতাহতরা সবাই পর্যটক।
জেলা প্রশাসক আরও জানান, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
