একই ঘরে বসে আছেন দুজন। পোশাকও প্রায় একই রকম। আশপাশের পরিবেশেও কোনো পার্থক্য নেই। অথচ পরদিন সকালে একজনের হাত-পা মশার কামড়ে লাল হয়ে ফুলে গেছে, অন্যজনের শরীরে কামড়ের চিহ্ন প্রায় নেই। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। প্রশ্ন হলো, একই পরিবেশে থেকেও কাউকে মশা বেশি কামড়ায় কেন?

গবেষকেরা বলছেন, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। রক্তের গ্রুপ থেকে শুরু করে ত্বকের স্বাভাবিক গন্ধ, শরীর থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ এবং নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া কার্বন ডাইঅক্সাইড, সবকিছুই মশাকে মানুষ চিনতে ও তার কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে। তবে কোনো একটি কারণ দিয়েই পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না।
রক্তের গ্রুপ কি দায়ী?
মশা কাদের বেশি কামড়ায়, তা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসে রক্তের গ্রুপের বিষয়টি। ২০০৪ সালে ‘জার্নাল অব মেডিক্যাল এনটোমোলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এশীয় বাঘ মশা নামে পরিচিত এক প্রজাতির মশার আচরণ পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় ৬৪ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, অন্য রক্তের গ্রুপের মানুষের তুলনায় ‘ও’ গ্রুপের মানুষের ওপর মশা বেশি বসেছে।
তবে ‘ও’ ও ‘এ’ গ্রুপের তুলনার ক্ষেত্রেই পার্থক্যটি পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। অর্থাৎ, সব প্রজাতির মশাই ‘ও’ গ্রুপের মানুষকে বেশি কামড়ায়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। একইভাবে শুধু রক্তের গ্রুপের ভিত্তিতে কে বেশি মশার কামড়ের শিকার হবেন, তা নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়।
ত্বকের গন্ধেও লুকিয়ে থাকতে পারে কারণ
মশা কেন কিছু মানুষকে বেশি পছন্দ করে, তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গেছে মানুষের ত্বকে থাকা রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৬৪ জন মানুষের ত্বক থেকে নির্গত গন্ধের প্রতি স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই মশার আকর্ষণ পরীক্ষা করেন গবেষকেরা। এই প্রজাতির মশা ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া ও হলুদ জ্বরের মতো রোগের জীবাণু ছড়াতে পারে।
গবেষণায় দেখা যায়, যাদের প্রতি মশার আকর্ষণ বেশি, তাদের ত্বকে কার্বক্সিলিক অ্যাসিড নামের কিছু রাসায়নিক পদার্থের মাত্রাও বেশি ছিল। এসব পদার্থ ত্বকের তেল ও অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে সম্পর্কিত। কয়েক বছর ধরে পর্যবেক্ষণেও ব্যক্তিভেদে মশার আকর্ষণের এই পার্থক্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল।
এ থেকে গবেষকেরা ধারণা করেন, কিছু মানুষের ত্বকে এমন এক ধরনের স্বাভাবিক রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যা মশাকে তুলনামূলক বেশি আকৃষ্ট করে। তবে শুধু কার্বক্সিলিক অ্যাসিডই মশার আকর্ষণের একমাত্র কারণ, গবেষণায় এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নিঃশ্বাস ও শরীরের তাপও গুরুত্বপূর্ণ
মশা মানুষকে খুঁজে বের করার জন্য একটি সংকেতের ওপর নির্ভর করে না। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মশার বিশেষ সংবেদনশীল অঙ্গ রয়েছে, যা মানুষের নিঃশ্বাস থেকে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড শনাক্ত করতে পারে। এর মাধ্যমে তারা আশপাশে সম্ভাব্য খাদ্যদাতা প্রাণীর উপস্থিতি বুঝতে পারে।
কাছাকাছি পৌঁছানোর পর মানুষের শরীরের গন্ধ, তাপ এবং অন্যান্য সংকেতও মশাকে লক্ষ্য নির্ধারণে সাহায্য করে। এসব সংকেতের সম্মিলিত প্রভাবেই মশা মানুষের উন্মুক্ত ত্বকের কাছে পৌঁছায় এবং কোথায় বসবে, তা নির্ধারণ করে।
এ কারণেই একই ঘরে থাকা দুজন মানুষের প্রতি মশার আকর্ষণ সমান নাও হতে পারে। তাদের শরীর থেকে নির্গত রাসায়নিক সংকেতের পার্থক্য এবং আশপাশের পরিবেশও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কামড়ের দাগ বেশি হলেই কি মশা বেশি কামড়েছে?
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সকালে ঘুম থেকে উঠে কারও শরীরে বড় বড় লাল ফোলা দাগ দেখা গেলে তিনি ধরে নিতে পারেন, অন্যদের তুলনায় তাকে বেশি মশা কামড়েছে।

কিন্তু সব সময় তা সত্য নয়। মশার কামড়ের পর ত্বকে কতটা ফোলা, লালচে ভাব বা চুলকানি হবে, তা ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ার ওপরও নির্ভর করে। ফলে কারও শরীরে কামড়ের দাগ বেশি স্পষ্ট হলেই যে তাকে অন্যদের চেয়ে বেশি কামড়ানো হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
মশার কামড় থেকে বাঁচবেন যেভাবে
রক্তের গ্রুপ বা ত্বকের স্বাভাবিক রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য সহজে পরিবর্তন করে মশার কামড় এড়ানোর নির্ভরযোগ্য উপায় নেই। তবে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করে মশার সংস্পর্শ কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ডিইইটি বা পিকারিডিনযুক্ত কার্যকর মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা যেতে পারে। এসব পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে গায়ে লেখা নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। পাশাপাশি ঢিলেঢালা, লম্বা হাতার পোশাক ও লম্বা প্যান্ট পরলে শরীরের উন্মুক্ত অংশ সুরক্ষিত রাখা যায়।
জানালায় মশা প্রতিরোধক জাল, প্রয়োজনে মশারি ব্যবহার এবং বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মশার কামড়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তবে কোন রোগ ছড়াবে, তা নির্ভর করে মশার প্রজাতি ও তার বহন করা জীবাণুর ওপর।
তথ্যসূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া
/অ
