Published on
:
3 min read
রণিতা চট্টোপাধ্যায়
আমরা ভুলে যাই। প্রতিটি পুরোনো কথা। দেশ পেরনোর কাঁটাতারের ক্ষত, লাশভর্তি ট্রেন, কৃষ্ণচূড়ার মতো পড়ে থাকা সত্তরের যুবকের ছিন্নশির, জলে ভেসে আসা আয়লান কুর্দির মুখ, প্যালেস্তাইনের নিহত শিশুদের ফুরোতে না-চাওয়া তালিকা, সব ভুলে যেতে চাই। ভুলতে থাকি গণতন্ত্রের শরীর জুড়ে ইতস্তত ক্ষত। মানুষের বাসভূমি তার স্মৃতিলোক, এ কথা সত্য বটে, কিন্তু ‘ওয়েস্টল্যান্ড’-এর হা-হা শূন্যতার কোটরে টিকে থাকা অধুনা মানুষের শরীরে মিশেছে ব্যাঙের রক্ত। বিস্মৃতির শীতঘুমই তার আত্মরক্ষণের হাতিয়ার। তবুও, পিছুটান তো জেগেই থাকে। এ উপত্যকাকে মানুষ যতই এড়িয়ে যেতে চাক, সমকাল এসে বসেছে সেখানে একা চ্যাপলিন সেজে। তার দিনলিপিতে তুলে রাখা সময়ের বারুদ আর বিষ। সেই গুপ্ত নথিকেই কোনও এক অন্তর্গত বোধের তাড়নায় খুঁড়ে দেখতে চেয়েছেন মলয় রক্ষিত, ‘সংস্কৃতির অসুখ-বিসুখ’ বইটিতে। যদিও লেখক জানাচ্ছেন তাঁর এই তদন্ত বাঙালি জীবনের পরিসরেই নিজের গণ্ডি টেনেছে, তবুও এ বইয়ের প্রবন্ধগুলির নেপথ্যে স্পষ্ট চিনে নেওয়া যায় আন্তর্জাতিক চিন্তা-দর্শনের চর্চাকে। ‘বৈনাশিকতা-উত্তর বাংলা সাহিত্য: হিরোশিমা নাগাসাকির সন্ধানে’ প্রবন্ধটিতে যে চর্চা যাবতীয় আড়াল ছেড়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বিগত দুই শতক জুড়ে বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের যে ঘটনাবহুল ও সংঘাতময় সাংস্কৃতিক চলন, সেই ইতিহাসকেই তিনি রাখতে চেয়েছেন অণুবীক্ষণের তলায়। যে ইতিহাস আত্মপরিচয়বিস্মৃত শিকড়হীন নাগরিক মধ্যবিত্তের সংগঠিত কিন্তু ফাঁপা ক্ষমতাতন্ত্র, কিংবা একক ব্যক্তিমানুষের অমোঘ পরাজয়ের আখ্যান। আর এই সুতোটিতেই জুড়েছে এ বইয়ের আপাত বিচ্ছিন্ন প্রবন্ধগুলি।
ক্ষমতাতন্ত্রের এই আধিপত্য প্রসঙ্গে এ বইয়ের দু’টি লেখার কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা চলে। ‘পপুলার লিট্রেচার: কালের আবর্জনা অথবা সাহিত্যের বড়োবাজার’ প্রবন্ধে মলয় এক দিকে ঔপনিবেশিক পিউরিটানিজ়ম-এর চোখে বাংলা জনতোষ সাহিত্যের প্রতি শুচিবাইকে চিনে নিয়েছেন, তেমনই হালের বড় গোষ্ঠীদের নিয়ন্ত্রণকামিতা ও বাজারি সাহিত্যের ধারার দিকেও নজর রেখেছেন। আর ‘আনন্দমঠ: দেশোদ্ধার অথবা হিন্দুরাজ্য’-এ এসেছে সিপাহি বিদ্রোহজাত জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করে সে দিনের শিক্ষিত বাঙালি কী ভাবে প্রাচীন ভারতীয় হিন্দু অধ্যায় থেকে জাতীয়তাবাদী প্রেরণা খুঁজেছিল, এবং সেই সন্ধানের আলোয় লেখক বুঝতে চেয়েছেন আনন্দমঠে নির্মিত ধর্ম অবলম্বনে স্বদেশ উদ্ধারের তাত্ত্বিক মডেলটি। জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম নামক ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন-এর দৈত্যটির ঘুম ও জাগরণ যে বরাবরই সাময়িকতার গণ্ডিতে বাঁধা, আজকের দিনকালের সঙ্গে সেই অভ্যাসকে মিলিয়ে পড়েছেন লেখক।
বাঙালি সংস্কৃতির অন্তরমহলে যে মারীবীজের সংক্রমণ বিগত সময় জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, সেই রোগ ও ক্ষয়ের ভাষ্য লিখে রাখতে চেয়েছেন মলয়। তবে এ বইকে শুধুমাত্র অসুখের ইতিকথন বলে দেখলে তাকে খণ্ডিত করা হবে। কেন-না প্রতিরোধের যে খণ্ড প্রকল্পগুলি এ সময়ে জারি থেকেছে, তারও বয়ানকে এ বই অস্বীকার করেনি। বইয়ের প্রথম পর্বে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিনয় মজুমদার, শুভেন্দু মাইতি প্রমুখ নানা লেখক-চিন্তকের পৃথক পৃথক চিন্তাপ্রস্থানকে খতিয়ে দেখা থেকেই তা স্পষ্ট। একেবারে শেষের পর্বটিতেও সুধীর চক্রবর্তীর সাক্ষাৎকার এবং শঙ্খ ঘোষ প্রসঙ্গে নিবন্ধটিতে সেই প্রবণতা আছে, যদিও বাকি বইয়ের তুলনায় এই পর্বটিকে খানিক প্রক্ষিপ্ত ঠেকে। একই কথা বলা চলে ‘পাতালের চিরকুট: স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গের কথামালা’ গদ্যটিকে নিয়ে, যা আসলে একটি বইয়ের সমালোচনা। এলোমেলো নিষ্ঠুর সময়কে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের মতো একজন চিন্তাবিদ কী ভাবে দেখছেন তার পরিচয় এ লেখায় এলেও, বইয়ের বাকি প্রবন্ধগুলির সঙ্গে একাসনের দাবি করা তার পক্ষে সঙ্কটের।
তবে লেখাগুলির অবয়বে যদি বা ভিন্নতা থাকে, আদতে তাদের অন্দরে সেই নির্মোহ স্বরকে জিইয়ে রাখতে চেয়েছেন মলয়। ভয়াবহ কোলাহল ভেদ করে যে অবিনাশ স্বর সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়ে যায়। তাই তাঁর ব্যক্তিগত লিখনভঙ্গিমা নিরাবেগ, কিন্তু পক্ষ সে নিয়েছে। আর সেই পক্ষ অবলম্বনের কাটাছেঁড়ার জেরেই এ বই পাঠককে স্বস্তি দেয় না। ‘রাত কত হল? উত্তর পেলে, মুখুজ্যে?’ সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে ঢাল করে লেখক এ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন পাঠকের দিকেই। এই কানা অন্ধকারের রাতে সন্ত্রস্ত যে উত্তরহীনতাকে চাপা দিয়ে রাখতে চাইছি, এ বই সেই দিশাহীনতাকে বেআব্রু করে দিতে পারে।
