শুভ্রদীপ্ত ভট্টাচার্য সুমন
কোজাগরী পূর্ণিমার লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে যুক্ত লোকাচার বাংলার সর্বত্র একরকম নয়। কোথাও প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে পুজো হয়, কোথাও লক্ষ্মীর সরা, কোথাও ঘটে দেবীর প্রতীকী উপস্থিতি, আবার কোথাও ধানের শিষ, শস্য, কলাগাছ এবং গৃহস্থালির উপকরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই বৈচিত্র্য থেকেই বোঝা যায়, বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতি কোনও একক বিধিবদ্ধ ছাঁচে নির্মিত হয়নি। শাস্ত্রীয় আচার, পুরাণকথা, স্থানীয় বিশ্বাস এবং পারিবারিক ঐতিহ্য পরস্পরের সঙ্গে মিশে তৈরি করেছে লক্ষ্মীপুজোর বহুমাত্রিক রূপ।
লোকাচার বলতে বোঝায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে জন্ম নেওয়া এবং প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত আচার-অনুশীলন। অন্যদিকে, দেশাচার বলতে নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জনপদের প্রচলিত রীতি ও প্রথাকে বোঝানো যায়। লক্ষ্মীপুজোর ক্ষেত্রে এই দুইয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন সব সময় সম্ভব নয়। একটি পারিবারিক প্রথা ক্রমে গোটা গ্রামের রীতিতে পরিণত হতে পারে, আবার কোনও আঞ্চলিক প্রথা এক পরিবারের মধ্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে টিকে থাকতে পারে।
কোথাও পুজোর আগে ঘরদোর পরিষ্কার করা, উঠোনে আলপনা আঁকা, লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ দেওয়া, ধানের শিষ ও শস্য সাজানো বিশেষ গুরুত্ব পায়। কোথাও বাড়ির প্রবেশপথ থেকে পূজাস্থল পর্যন্ত লক্ষ্মীর পদচিহ্ন আঁকার মধ্যে দেবীর আগমন কামনা করা হয়। আবার কোথাও চালের গুঁড়ো, ফুল, প্রদীপ এবং ঘটের বিন্যাসে গড়ে ওঠে নিজস্ব আঞ্চলিক রীতি। এইসব আচারের মধ্যে দেবীকে আহ্বানের পাশাপাশি সংসারে অন্ন, শান্তি ও নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়।
বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজে লক্ষ্মীর সঙ্গে শস্যের সম্পর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ধান শুধু খাদ্য নয়, কৃষকের শ্রম, পরিবারের সঞ্চয় এবং আগামী দিনের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। তাই লক্ষ্মীপুজোর উপকরণে ধান, চাল, খই কিংবা শস্যের উপস্থিতি নিছক ধর্মীয় প্রতীক নয়; তা কৃষিনির্ভর সমাজের বস্তুগত বাস্তবতার সাংস্কৃতিক প্রকাশ।
লক্ষ্মীর সরা বাংলার এক স্বতন্ত্র লোকশিল্প। সাধারণভাবে সরা বলতে মাটির তৈরি অগভীর গোলাকার পাত্র বা পাত্রের মতো ফলককে বোঝায়। লক্ষ্মীপুজোর জন্য তৈরি সরার গায়ে দেবীর মুখ, অবয়ব, পদ্ম, পেঁচা, ধানের শিষ, লতা-পাতা কিংবা অন্যান্য শুভ প্রতীক আঁকা হয়। অঞ্চল ও শিল্পীর রীতি অনুযায়ী এর আকার, রং, অলংকরণ এবং চিত্ররীতিতে পার্থক্য দেখা যায়।
সরা শিল্পের গুরুত্ব এইখানে যে, এটি দৈনন্দিন ব্যবহারের মাটির সামগ্রীকে ধর্মীয় ও নান্দনিক মর্যাদায় উন্নীত করে। মাটির উপর রং ও রেখার সাহায্যে শিল্পী এমন একটি দৃশ্যভাষা নির্মাণ করেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য। দেবীর মুখাবয়ব কিংবা পদ্মের নকশা বুঝতে দর্শকের শিল্পকলার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রয়োজন হয় না। লোকশিল্পের শক্তি এখানেই—তার ভাষা পরিচিত, অথচ তার প্রকাশভঙ্গি স্বতন্ত্র।
সরার চিত্ররীতিতে অনেক সময় এক ধরনের প্রতীকী সরলতা লক্ষ্য করা যায়। দেবীর মুখের গঠন, চোখের রেখা, অলংকারের বিন্যাস কিংবা পদ্মের আকার বাস্তবের হুবহু অনুকরণ নয়; বরং শিল্পীর নিজস্ব রীতিতে দেবীর পরিচিত রূপকে প্রকাশ করা। এই রীতির মধ্যেই লোকশিল্পের ঐতিহ্য টিকে থাকে।
তবে সব সরা একইভাবে আঁকা হয় না। কোনও সরা প্রধানত দেবীমুখকেন্দ্রিক, কোনওটিতে দেবীর পূর্ণাঙ্গ অবয়ব থাকে, আবার কোনও কোনও ধারায় একাধিক দেবমূর্তি বা পৌরাণিক চিত্রের সমাবেশ দেখা যায়। স্থানীয় শিল্পপরম্পরা, ক্রেতার পছন্দ এবং শিল্পীর দক্ষতা এই পার্থক্য তৈরি করে।
সরা শিল্পের সমাজতত্ত্ব বুঝতে গেলে শিল্পীদের জীবন ও শ্রমের দিকে তাকানো জরুরি। যাঁরা সরা তৈরি করেন, তাঁদের মধ্যে মৃৎশিল্পী, পটুয়া এবং লোকচিত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কারিগর থাকতে পারেন। তাঁদের সকলের কাজের ধরন এক নয়। কোথাও মাটির পাত্র তৈরির সঙ্গে চিত্রাঙ্কন যুক্ত, কোথাও তৈরি সরা কিনে তার উপর ছবি আঁকা হয়, আবার কোথাও পারিবারিকভাবে শেখা বিশেষ চিত্ররীতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করা হয়।
এই শিল্পচর্চার একটি বড় অংশই ঐতিহাসিকভাবে পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করেছে। ছোটবেলা থেকে শিশুরা বাড়ির বড়দের কাজ দেখতে দেখতে রং প্রস্তুত করা, রেখা টানা, নকশা আঁকা এবং সরার পৃষ্ঠে চিত্র বসানোর কৌশল শিখেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এই দক্ষতা অর্জনের জন্য কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার সুযোগ ছিল না। শিল্পীর কর্মশালাই হয়ে উঠেছে তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
কিন্তু ঐতিহ্যের এই ধারাবাহিকতার আড়ালে রয়েছে জীবিকার অনিশ্চয়তা। পুজোর মরশুমে সরা বিক্রির চাহিদা বাড়লেও বছরের অন্য সময়ে সেই আয় বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। কাঁচামালের দাম, পরিবহণের খরচ, মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা এবং ক্রেতার দরকষাকষি শিল্পীর উপার্জনকে প্রভাবিত করে। যাঁর হাতে শিল্পের মূল্য সৃষ্টি হয়, বাজারে সেই শিল্পের চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্যের পুরোটা তাঁর হাতে পৌঁছয় না।
এই বাস্তবতা লোকশিল্পের একটি মৌলিক বৈপরীত্য প্রকাশ করে। সমাজ শিল্পীর তৈরি দেবীর ছবিকে পবিত্র বলে গ্রহণ করে, কিন্তু শিল্পীর নিজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে সব সময় সমান গুরুত্ব দেয় না। সরা পূজাস্থলে প্রতিষ্ঠিত হয়; অথচ তার নির্মাতার সংসারে অভাব থেকে যেতে পারে।
সরা শিল্পের উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় অঞ্চল ও পরিবারভেদে নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোথাও তাঁরা রং তৈরি, প্রাথমিক নকশা, অলংকরণ কিংবা বিক্রির কাজে অংশ নেন; কোথাও পরিবারের পুরুষ ও নারী শিল্পীরা পৃথক বা সম্মিলিতভাবে কাজ করেন। এই ভূমিকার প্রকৃতি সর্বত্র এক নয়, তাই নির্দিষ্ট কোনও একটি চিত্রকে সমগ্র বাংলার বাস্তবতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তবু একটি বিষয় স্পষ্ট: পারিবারিক লোকশিল্পে নারীর অবদান অনেক সময় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় না। পরিবারের শিল্পী হিসেবে পরিচিতি হয়তো পুরুষ সদস্যের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়, অথচ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর শ্রমও সমান গুরুত্বপূর্ণ থাকে। লোকশিল্পের ইতিহাস লিখতে গেলে এই অদৃশ্য শ্রমকে দৃশ্যমান করা দরকার।
একই সঙ্গে পরিবর্তিত বাজার, নতুন প্রজন্মের বিকল্প পেশার আকর্ষণ এবং ঐতিহ্যগত শিল্পে কম আয়ের সম্ভাবনা এই উত্তরাধিকারকে দুর্বল করতে পারে। শিল্পীর সন্তান অন্য পেশায় গেলে তাকে দোষ দেওয়া যায় না। ঐতিহ্য রক্ষা করার দায় শুধু শিল্পীর পরিবারের নয়; ক্রেতা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং বৃহত্তর সমাজেরও।
লক্ষ্মীর সরা আমাদের শেখায়, শিল্পের ইতিহাস শুধু রাজপ্রাসাদ, বড় সংগ্রহশালা কিংবা প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের ইতিহাস নয়। সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে ব্যবহৃত বস্তুতেও শিল্পের গভীর ঐতিহ্য বেঁচে থাকতে পারে। এই শিল্পে যেমন ধর্মীয় বিশ্বাস আছে, তেমনই রয়েছে শ্রমের ইতিহাস, আঞ্চলিক পরিচয় এবং মানুষের সৌন্দর্যবোধ।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সময় আমরা দেবীর সামনে ধনসম্পদ ও মঙ্গলের প্রার্থনা করি। কিন্তু সেই মঙ্গলের ধারণা যদি শিল্পীর ন্যায্য পারিশ্রমিক, তাঁর পরিবারের শিক্ষার সুযোগ, চিকিৎসা এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে অন্তর্ভুক্ত না করে, তবে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শিল্পকে ভালবাসার অর্থ শুধু শিল্পকর্ম কেনা নয়; শিল্পীর শ্রমকে যথাযথ মূল্য দেওয়া, তাঁর নাম ও শিল্পপরম্পরাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সেই ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করাও তার অংশ।
সরা শিল্পকে সংরক্ষণ করতে হলে তাকে কেবল উৎসবের মরসুমি সামগ্রী হিসেবে দেখলে চলবে না। স্থানীয় শিল্পীদের কাজ নথিবদ্ধ করা, তাঁদের নিজস্ব বক্তব্য সংগ্রহ করা, শিল্পরীতির আঞ্চলিক পার্থক্য চিহ্নিত করা এবং সরাসরি শিল্পীর কাছ থেকে সরা কেনার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। বিদ্যালয়, সংগ্রহশালা ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিও এই শিল্পের সামাজিক ইতিহাস তুলে ধরতে পারে।
কোজাগরীর রাতে লক্ষ্মীর সরার সামনে প্রদীপ জ্বালানোর অর্থ শুধু দেবীর আগমন কামনা নয়। সেই সরার প্রতিটি রেখার পিছনে রয়েছে কোনও মানুষের শ্রম, কোনও পরিবারের উত্তরাধিকার, কোনও অঞ্চলের স্মৃতি এবং বাংলার লোকসংস্কৃতির দীর্ঘ যাত্রা।
দেবীকে আরাধনা করা হয় মঙ্গলের আশায়; আর যে শিল্পীর হাতে দেবীর রূপ ফুটে ওঠে, তাঁর জীবনে মঙ্গল প্রতিষ্ঠা করাও সেই আরাধনার মানবিক তাৎপর্যেরই অংশ।
