কুমিল্লার দাউদকান্দি ও তিতাস উপজেলায় প্রাণিসম্পদ সেবা কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে সংকট। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে পশু-পাখির চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ, খামারিদের প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম। একই সঙ্গে চাহিদার তুলনায় ওষুধ ও টিকার সীমিত বরাদ্দে ভোগান্তিতে পড়ছেন গবাদিপশু ও পোলট্রি খামারিরা। ফলে প্রাণিসম্পদ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং খামারিদের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হচ্ছে।
দাউদকান্দি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল পাশের তিতাস উপজেলার পশুপালকেরাও। কিন্তু সীমিত জনবল দিয়ে দুই উপজেলার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে।
১১টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র সাতজন
দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দাউদকান্দি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে অনুমোদিত ১১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র সাতজন। অফিস সহকারী ও অফিস সহায়কের পদ দুটি শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া উপসহকারী পর্যায়ের চারটি পদের মধ্যে তিনটিই খালি। আগামী ডিসেম্বর মাসে আরও একজন কর্মী চলে গেলে জনবলসংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে খামার পরিদর্শন, রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা এবং খামারিদের সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন ৬০-৭০ জন
দাউদকান্দি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এমদাদুল হক বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। এ ছাড়া ফোনের মাধ্যমেও অনেক পশুপালককে চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ দিতে হয়।
তিনি বলেন, পর্যাপ্ত জনবল থাকলে মাঠপর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতো। একই সঙ্গে খামারিদের প্রশিক্ষণ, রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হতো। জরুরি পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে পশু উদ্ধার ও চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও জনবলস্বল্পতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তাঁর মতে, প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়াই যথেষ্ট নয়। খামার পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, রোগের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ এবং আধুনিক পদ্ধতিতে পশুপালন সম্পর্কে খামারিদের প্রশিক্ষণ দেওয়াও জরুরি।
প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার ঘাটতি
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এমদাদুল হক জানান, পোলট্রি খামারে ওষুধের যথাযথ ব্যবহার এবং গবাদিপশু মোটাতাজাকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনেক খামারির প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। এসব বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া এবং কার্যক্রম তদারক করতে পর্যাপ্ত জনবল প্রয়োজন।
অন্যদিকে, তিতাস উপজেলায় ভেটেরিনারি চিকিৎসক না থাকায় সেখানকার পশুপালকদেরও চিকিৎসার জন্য দাউদকান্দিতে আসতে হচ্ছে। এতে দাউদকান্দি হাসপাতালের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। দুই উপজেলার খামারিদের চাহিদা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা না গেলে মানসম্মত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চাহিদার তুলনায় কম ওষুধ ও টিকা
জনবলসংকটের পাশাপাশি ওষুধের সীমিত বরাদ্দও খামারিদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডা. এমদাদুল হক বলেন, পশুপালক ও খামারির সংখ্যা বিবেচনায় হাসপাতালে ওষুধের চাহিদা বেশি। সরকারি সরবরাহের আওতায় নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ ও টিকা বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। তবে সব ধরনের ওষুধ ও টিকা সব সময় বিনা মূল্যে সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।
এ কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পশুর চিকিৎসার জন্য খামারিদের নিজ উদ্যোগে ওষুধ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ছোট ও অসচ্ছল খামারিদের জন্য এ ব্যয় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
চিকিৎসা নিতে এসে ওষুধ কিনতে হচ্ছে খামারিদের
তিতাস উপজেলার ইউসুফপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি গরু পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে দাউদকান্দি উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা ও ওষুধের পরামর্শ নিচ্ছেন।
অন্যদিকে, দাউদকান্দির নন্দনপুর থেকে আসা জহিরন বেগম তাঁর গাভির দুধ কমে যাওয়ায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁকে ওষুধ সংগ্রহ করতে হয়েছে।
খামারিদের এমন অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সরকারি প্রাণিচিকিৎসাসেবা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও ওষুধের সীমিত সরবরাহের কারণে সব ক্ষেত্রে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে না।
জনবল বাড়ানোর আহ্বান কৃষি বিশেষজ্ঞের
জাতীয় পরিবেশ ও কৃষি পদকপ্রাপ্ত এগ্রিকালচারাল ইম্পর্ট্যান্ট পারসন (এআইপি) অধ্যাপক মতিন সৈকত বলেন, কৃষিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে জনবলসংকট খাদ্য উৎপাদন ও কৃষকের আয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর মতে, প্রাণিসম্পদ সেবা শক্তিশালী হলে পশুপালকেরা উপকৃত হবেন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নিয়োগপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আশা
কুমিল্লা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামছুল আলম প্রতিনিধি সাইফুল ইসলামকে বলেন, জনবলসংকট প্রায় সব জায়গাতেই রয়েছে। এ বিষয়ে বছরে দুইবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়। মন্ত্রীর সফরের সময়ও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের নিয়োগপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এ সংকট নিরসন সম্ভব। অন্যদিকে, ওষুধের বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি জানান, বরাদ্দ করা বাজেটের তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি। এ কারণে সীমিত বরাদ্দের মধ্যে অসচ্ছল ও দরিদ্র খামারিদের অগ্রাধিকার দিয়ে ওষুধ সরবরাহের চেষ্টা করা হয়।
প্রাণিসম্পদ সেবা জোরদারে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দাউদকান্দি ও তিতাসে প্রাণিসম্পদ সেবার মান বাড়াতে শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগ, ওষুধ ও টিকার বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং খামারিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তিতাস উপজেলায় ভেটেরিনারি চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা গেলে দুই উপজেলার পশুপালকদের ভোগান্তি কমবে।
প্রাণিসম্পদ খাত গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এ খাতের উন্নয়নে সরকারি সেবার পরিধি বাড়ানো এবং মাঠপর্যায়ে চিকিৎসা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে খামারিরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি গবাদিপশু ও পোলট্রি উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হবে।
The post দাউদকান্দি-তিতাসে প্রাণিসম্পদ সেবায় সংকট appeared first on SATV.
