১০ বছর আগের দৃশ্যপট আর বর্তমান বাস্তবতায় যেন আকাশ-পাতাল তফাৎ। একসময় লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সাপটিবাড়ী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের দৌলজোর গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই জ্বলত মাটির তৈরি খড়ির চুলা। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকত রান্নাঘর। কালের পরিক্রমায় আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে এই গ্রামেও। মাটির চুলার জায়গা পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে এলপিজি সিলিন্ডার। তবে একসময়ের স্বস্তির এই গ্যাস এখন গ্রামবাসীর কাছে দুশ্চিন্তার কারণ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খড়ির মূল্যবৃদ্ধি এবং ধোঁয়াযুক্ত পরিবেশে রান্না করার ঝামেলা এড়াতে দৌলজোর গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে সিলিন্ডার গ্যাসের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। হাতের কাছে সহজলভ্যতা এবং প্রথম দিকের সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে খুব দ্রুতই এই পরিবর্তন ঘটে। একে একে গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই মাটির চুলার ব্যবহার বিলুপ্ত হয়ে যায়। সিলিন্ডার গ্যাসের পরিচ্ছন্ন ও ঝামেলাহীন ব্যবহার গ্রামীণ নারীদের জীবনে এনে দিয়েছিল নতুন এক স্বস্তি। তবে এখন যেন তার উল্টো চিত্র।
বিজ্ঞাপন
সাপটিবাড়ী বাজারের গ্যাস সিলিন্ডারের খুচরা বিক্রেতা এখলাছুর রহমান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আজ থেকে ১০ বছর আগে যখন ব্যবসা শুরু করি, তখন অনেকেই গ্যাসে রান্না করতে ভয় পেত। মনে করত এই বুঝি বিস্ফোরণ হলো! পরবর্তীতে যখন এর ব্যবহার শিখল, তখন সবাই মাটির চুলা বাদ দিয়ে গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে শুরু করে। প্রতি মাসে শুধু এই গ্রামের মানুষই আমার কাছ থেকে প্রায় ২০০টি সিলিন্ডার কিনত।’
তিনি জানান, শুরুর দিকে যে গ্যাস সিলিন্ডার ছিল সহজলভ্য ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে, বর্তমানে তা কিনতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন গ্রামবাসী। একসময় যে এলপিজি সিলিন্ডার কেনা যেত মাত্র এক হাজার টাকায়, বর্তমানে তা কিনতে গুনতে হচ্ছে এক হাজার ৯০০ থেকে এক হাজার ৯৫০ টাকায়। প্রায় দ্বিগুণ এই মূল্যবৃদ্ধিতে গ্রামীণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে।
বিজ্ঞাপন

স্থানীয় বাসিন্দা মাহফুজা রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে তো খড়ি পাওয়া যেত, তা দিয়েই চুলায় রান্না হতো। এখন সবকিছু গ্যাসে রান্না হয়। খড়ি কিনে আনা, প্রসেস করা—এসবের নানা ঝামেলা ছিল। একটি সিলিন্ডার আনলেই এক নিমিষে সব ঝামেলা এড়ানো যেত। দামেও খড়ির চেয়ে সাশ্রয়ী হতো। কিন্তু বর্তমানে আর সেটি স্বাভাবিক দামে নেই, দাম এখন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আগের মতো খড়িও পাওয়া যাচ্ছে না।’
গ্রাহকরা বলছেন, দামের এত ঊর্ধ্বগতি সত্ত্বেও এলপি গ্যাস এখন আর চাইলেই বাদ দেওয়ার উপায় নেই। এটি সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। চড়া দাম জেনেও বাধ্য হয়েই গ্যাস কিনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। একদিকে খড়ি বা লাকড়ি সংগ্রহ করার মতো পরিবেশ এখন আর আগের মতো নেই, অন্যদিকে চড়া দামে গ্যাস কেনা—সবমিলিয়ে উভয় সংকটে পড়েছেন দৌলজোর গ্রামের মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দা মিষ্টি আক্তার তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে চুলা ধরাতে গিয়ে ধোঁয়া খেতে হতো। চোখ-নাক-মুখ কালো হয়ে যেত। আর এখন গ্যাসে রান্না করি, কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয় না। গ্যাসে রান্না করতে ভালোই লাগে। কিন্তু সেই গ্যাসের দাম যদি আমাদের ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তবে আমাদের জন্য খুব কষ্টকর হয়ে যায়। সরকারের উচিত আমাদের দিকটি বিবেচনা করে গ্যাসের দাম কমানো।’
বিজ্ঞাপন
গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আরেক বাসিন্দা হৃদয় সরকার। তিনি বলেন, ‘বর্তমান বাজারে যা-ই কিনতে যাই না কেন, আমাদের আয় অনুযায়ী আর কুলিয়ে উঠতে পারছি না। কোথাও না কোথাও ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। জীবন বাঁচানোর জন্য খাদ্যের প্রয়োজন, আর তা রান্না করে খাওয়াটাও জরুরি। সেই আগুন জ্বালাতে মাসে আমাদের প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে, যা আগে এক হাজার টাকার মধ্যেই হয়ে যেত।’
তিনি বলেন, ‘দাম বেড়েছে কিন্তু আমাদের আয় তো বাড়েনি! সরকারের কাছে আমাদের দাবি, গ্যাস সিলিন্ডারের দাম কমানো হোক।’
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর লালমনিরহাটের সহকারী পরিচালক মো. শেখ সাদী জাগো নিউজকে বলেন, ‘নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করা হলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। আমরা মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করছি এবং অনিয়ম পেলে জরিমানাও করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোম্পানির ডিলার পয়েন্টগুলোতে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা হলেও খুচরা পর্যায়ে, বিশেষ করে হাটবাজার ও বিভিন্ন দোকানে দাম নিয়ে অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতারা সরকারি নির্ধারিত মূল্য মানছেন না। কোনো দোকানদার নির্ধারিত দামের বেশি নিলে ভোক্তাদের অভিযোগ করার আহ্বান জানাচ্ছি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এসআর/এএসএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
