Published on
:
2 min read
মহম্মদ মহসিন, উলুবেড়িয়া
সংখ্যাটা ১০৮। কোনও লটারির টিকিটের নম্বর নয়। এই সংখ্যাতেই তো লক্ষ্মীলাভ! তাই ফি বছর এই সময়টাতেই বাড়তি আয়ের আশায় মুখিয়ে থাকেন পদ্মফুল চাষিরা। পুব আকাশে সূর্যের ওঠার আগেই ঝিলের কালো জলে ডোঙা ভাসান উত্তম, মদন, পঙ্কজরা। আঙুলের ডগা দিয়ে অতি সন্তর্পণে একটি একটি করে না-ফোটা পদ্ম তুলে ডোঙায় ভরেন। পদ্ম সঞ্চয়নের এহেন রোজনামচায় অন্যথা হয় না পঙ্কজদের।
দক্ষিণ-পূর্ব রেলের হাওড়া-খড়গপুর শাখার রেলের বাগনান, কুলগাছিয়া এলাকায় গেলে দেখা মেলে উত্তম, মদন, বিশ্বনাথদের ব্যস্ততা। হাতেগোনা ক'দিন পরে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। এই বছরে দুর্গাপুজোর সময়ে পদ্মফুলের চাষিরা ভালো আয়ের আশায় আছেন। উৎপাদন অন্য বছরের তুলনায় ভালো হওয়ায়, তাঁরা আশাবাদী। পুজোর সময়ে অন্যান্য - ফুলের পাশাপাশি পদ্মেরও চাহিদা থাকে।
বিশেষ করে অষ্টমী পুজোর দিন। সেখানে ১০৮টি পদ্মের প্রয়োজন হয়। স্বাভাবিক ভাবেই, এই সময়ে পদ্মফুলের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। এ-ও বেশ প্রতীকী ইঙ্গিত যে, রাজ্যে পালাবদলের পরেই এ বছর পদ্ম দলের প্রতীক ফুলটি যথেষ্ট উৎপাদিত হয়েছে। অন্যান্য বছরে দুর্গাপুজোর সময়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও অন্যান্য কারণে উৎপাদন কম হলে, এই চাষের সঙ্গে যুক্ত চাষিরা সমস্যায় পড়েন।
প্রসঙ্গত, দক্ষিণ-পূর্ব রেলের বীরশিবপুর, কুলগাছিয়া, বাগনান, দেউলটি-সহ শহরতলি এলাকার বিভিন্ন রেলের লাইনের পাশের ঝিলগুলিতে পদ্মের চাষ হয়। রেলের ঝিল এবং জলাশয়ের পাশাপাশি, সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে পদ্মচাষ এখন ধান জমিতেও হচ্ছে। হাওড়া গ্রামীণ জেলার বাগনান এক নম্বর ব্লকের দুর্লভপুর ও রাস্তি গ্রাম, উলুবেড়িয়া এক নম্বর ব্লকের মহাদেবপুর, এমনকী, উদয়নারায়ণপুরেও ধান জমিতে ফুটছে পদ্ম। দুর্লভপুর ও রাস্তি গ্রামের প্রায় ১৩০ বিঘা ধান জমিতে পদ্ম ফুলের চাষ হচ্ছে। বাগানানের দুর্লভপুরের পদ্মচাষি উত্তম রায়, মদন মান্না, পঙ্কজ মান্নারা জানান, এই বছর পদ্মফুলের চাষ ভালো হয়েছে। তাই তাঁরা আশাবাদী, এবার পদ্মে তাঁদের ভালোই লক্ষ্মীলাভহবে। কলকাতার মল্লিকঘাট, কোলাঘাট বাজারে বিক্রি হয় এখানকার পদ্ম। ফুলচাষি পুলক ধাড়া জানান, বর্তমানে একটি পদ্ম ফুলের দাম চার থেকে ছ'টাকা। দুর্গাপুজোর সময়ে এই ফুলের দাম দ্বিগুণ থেকে তিনগুন বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে সাধারণ ফুলচাষিরা লাভবান হতে পারবেন।
কিন্তু সমস্যা অন্য এক জায়গায়। এই বিষয়ে সারা বাংলা ফুলচাষি ও ফুল ব্যবসায়ী সমিতির রাজ্য সম্পাদক নারায়ণচন্দ্র নায়েক বলেন, 'দুর্গাপুজোর চাহিদা সামলাতে আগে থেকেই পদ্মফুল হিমঘরে সংরক্ষিত করতে হয়। তবে পদ্ম সংরক্ষিত করার জন্য হাওড়া জেলায় কোনও হিমঘর নেই। পূর্ব মেদিনীপুরের পাশকুঁড়ায় ফুল সংরক্ষণের জন্য হিমঘর আছে। হাওড়া জেলায় এই ধরনের হিমঘরে না থাকায়, পদ্ম-সহ অন্যান্য ফুলচাষি বাধ্য হয়ে বহুমুখী হিমঘরে পদ্ম ফুল সংরক্ষণ করেন।' তিনি জানান, বহুমুখী হিমঘরে ফুল রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, ফুল রাখার জন্য যে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা দরকার, সেটা বেশি থাকে। ফলে, বহুমুখী হিমঘরে রাখা পদ্মের কিছুটা নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতির মুখে পড়েন চাষিরা। তবে পুজোর সময়ে যে সব উদ্যোক্তা একেবারে টাটকা পদ্মফুল চাইবেন, তাঁদের সেই ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশি দামে পদ্ম কিনতে হবে।
তিনি বলেন, 'এই টাটকা পদ্মফুলের দাম ৩০ থেকে ৪০ টাকা হয়ে যেতে পারে। পদ্মচাষিরা খুশি আরও একটা বিশেষ কারণে। রাজ্যে পালাবদলের পরে পদ্মের চাহিদা শুধু পুজোর সময়েই সীমাবদ্ধ নেই। বারোমাসই বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শাসকদলের প্রতীক ফুলটির প্রয়োজন পড়ে। মিটিং, মিছিল, সংবর্ধনা কিংবা বড় কনফারেন্সের সময়ে পদ্মে সাজানো মঞ্চই চান দলীয় নেতা-কর্মীরা। সেই দিক থেকে দেখলে এ বছর পদ্মের অধিক উৎপাদন বিভিন্ন দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ।
