শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেয়েছেন ‘ককরোচদের’ তিন মুখ— অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা। বলে দেওয়া হয়েছে, আগামী এক বছরের জন্য তাঁরা কোথাও শান্তি ভঙ্গ করতে পারবেন না। তবে রাস্তার আন্দোলন যে বন্ধ হচ্ছে না, তিন যুবনেতার মুক্তির পর ফের তা স্পষ্ট করে দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। একই সঙ্গে বিঁধেছে নরেন্দ্র মোদীর সরকারকেও। দেশকে ‘গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতির’ দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে কেন্দ্রকে দুষেছে তারা।
‘ককরোচদের’ যন্তর মন্তর অভিযান ঘিরে শনিবার দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়িয়েছিল দিল্লিতে। দিল্লি বিমানবন্দর থেকেই আটক হয়েছিলেন দীপকে, সৌরভ এবং আশুতোষ। সিজেপির আন্দোলনে সমর্থন জানাতে আসা ধ্রুব রাঠীও আটক হয়েছিলেন গুরুগ্রামের বাড়ি থেকে। ধ্রুবকে শনিবার রাতেই ছেড়ে দেয় পুলিশ। তবে আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে গ্রেফতার করা হয় সিজেপি-র তিন মাথাকে। রবিবার সকালে দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট থানায় এগ্জ়িকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করানো হলে, শর্তসাপেক্ষে ছাড়া পান তাঁরা। এর পরই সাংবাদিক বৈঠক ডেকে ফের কেন্দ্রকে একহাত নেন সিজেপি নেতৃত্ব।
পুলিশের হেফাজত থেকে মুক্তির পর সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।
দীপকে অবশ্য সাংবাদিক বৈঠকে ছিলেন না। শনিবার আটক হওয়ার পর পরই তাঁর ঠাকুরমার মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসে। এ দিন মুক্তি পাওয়ার পরে পরিবারের সঙ্গে থাকার জন্য মহারাষ্ট্রে ফিরে যান সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা। তবে মুক্তির পরে কেন্দ্রকে বিঁধে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন তিনি। ‘‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদী ভারতের লজ্জা। এর চেয়ে বড় কোনও কাপুরুষ ও গুন্ডা প্রকৃতির মানুষকে এই দেশে এর আগে দেখা যায়নি,’’ লেখেন দীপকে। একইসঙ্গে জানিয়ে দেন, এই আন্দোলন থামবে না।
শনিবার আন্দোলনকারীদের যন্তর মন্তরের ধারে কাছে ঘেঁষতে দেয়নি পুলিশ। যেখানেই জমায়েতের চেষ্টা হয়েছে, সেখানেই চলছে পুলিশি ধরপাকড়। তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আটকশিবিরে। শনিবারের ওই ধরপাকড়কে ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গাঁধীর আমলের জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছে সিজেপি। সাংবাদিক বৈঠক থেকে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে ‘স্বৈরাচারী’ বলেও আক্রমণ শানান সৌরভ এবং আশুতোষ। একই সঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘আসল দেশদ্রোহী’ বলেও কটাক্ষ করেন ‘ককরোচেরা’। জ্ঞানেশকে ‘বাঁচাতে’ বিজেপি কেন এত ‘তৎপর’, তা নিয়েও এ দিন প্রশ্ন তোলেন সিজেপি নেতৃত্ব।
দিল্লি পুলিশকে এবং কেন্দ্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আশুতোষ বলেন, “আমাদের লড়াই সবে শুরু হল।” শনিবারের পরিস্থিতির জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের লজ্জিত হওয়া উচিত বলেও জানান তিনি।
সিজেপির শনিবারের কর্মসূচিতে কোনও অনুমতি দেয়নি শাহের দিল্লি পুলিশ। সে বিষয়ে কর্মসূচির আগের রাত থেকেই মাইকে প্রচার করা হচ্ছিল। প্রাথমিক ভাবে পুলিশের একটি সূত্রের ব্যাখ্যা ছিল, নিয়ম অনুযায়ী ১০ দিন আগে অনুমতি চেয়ে আবেদন করতে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অনুমতি চাওয়া হয়েছিল মাত্র তিন দিন আগে। এ বার সিজেপি-র সাংবাদিক বৈঠকের পরে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিল্লি পুলিশও।
দিল্লিতে আটক হওয়া আন্দোলনকারীদের বাসে করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
কেন ‘ককরোচদের’ কর্মসূচিতে অনুমতি দেওয়া হয়নি, এ দিন তা নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেন দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার নেহা যাদব। এর আগে নিট প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে গত জুলাইয়ে যন্তর মন্তরে অবস্থান বিক্ষোভ করেছিল সিজেপি। সে প্রসঙ্গ টেনে ডেপুটি কমিশনার জানান, গত জুলাই মাসে যন্তর মন্তরে অবস্থান চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল সিজেপি-কে। কিন্তু সে সময় আন্দোলনকারীরা আইন মেনে কাজ করেনি বলে দাবি তাঁর। দিল্লি পুলিশের ডিসির কথায়, “এর আগে যখন অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তারা আইন মানেনি। তাদের জমায়েতে থাকা অনেকে পাথর ছুড়েছিলেন, অস্ত্র এনেছিলেন। এর ফলে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হয়েছিল।” এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং উদ্যোক্তাদের নিয়ম না-মানার নজির মাথায় রেখেই কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি।
আটক নয়, অপহরণ: ধ্রুব
শনিবার বেশি রাতের দিকে গুরুগ্রাম পুলিশের হেফাজত থেকে মুক্ত হন ইউটিউবার ধ্রুব। বাড়ি ফেরার পরে রবিবার সকালে একটি ভিডিয়োবার্তা প্রকাশ করেন তিনি। ধ্রুবের অভিযোগ, তাঁকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি— তাঁকে ‘অপহরণ’ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, “সাধারণ পোশাক পরা লোকজন আমার মাকে ধাক্কা মেরে ভিতরে ঢোকেন এবং সোজা চলে আসেন আমার শোয়ার ঘরে… গুন্ডা পাঠিয়ে আমাকে অপহরণ করা হয়েছে।” ধ্রুবের অভিযোগ, ৫০ জনেরও বেশি ‘গুন্ডা’ তাঁর বাড়ির বাইরে ঘোরাফেরা করছিল সকালে। তাঁর দাবি, শোয়ার ঘর থেকে অপরাধীর মতো টানতে টানতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়, গাড়িতে তোলা হয়। মোদী সরকারের সমালোচনা করে ধ্রুব বলেন, “এটা গণতন্ত্রে হতে পারে না। মোদী এই দেশে স্বৈরতন্ত্র চালু করে দিয়েছেন। সোজা কথায়, অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। এ সব জরুরি অবস্থার সময় হত। উত্তর কোরিয়ায় হয়।’’
ফের বিক্ষোভ, ফের আটক
এ দিন ফের যন্তর মন্তরে জমায়েতের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। সেই মতো প্রস্তুত ছিল পুলিশও। দিনভর চলে ধরপাকড়। আন্দোলনকারীদের ধরে ধরে বাসে, প্রিজ়ন ভ্যানে তোলা হয়। এ দিনের ধরপাকড় মূলত সীমিত থাকে যন্তর মন্তরের অদূরে কনট প্লেস এবং সংলগ্ন এলাকায়। সকাল থেকে দফায় দফায় জমায়েতের চেষ্টা হয় যন্তর মন্তরের অদূরে কনট প্লেসে। সকালে সিজেপি এবং বেশ কিছু ছাত্র সংগঠনের সমর্থকেরা হাজির হয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। দুপুরে কনট প্লেসে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে আটক হন সিপিএমের রাজ্যসভার সাংসদ জন ব্রিটাস। পরে আইসা নেত্রী নেহা বোরার নেতৃত্বে একদল ছাত্র-যুব ব্যারিকেড টপকে কনট প্লেসের দিকে এগোতে শুরু করেন। নেহা-সহ তাঁদেরও আটক করা হয়। সন্ধ্যায় ফের কনট প্লেসের কাছে জমায়েত করেন একদল বিক্ষোভকারী। তাঁদের মধ্যে এসএফআই নেত্রী ঐশী ঘোষও ছিলেন। সংগঠনের দাবি, তাঁকেও আটক করেছে পুলিশ।
রবিবার দুপুরে দিল্লিতে কনট প্লেসের কাছে আটক হন আইসা নেত্রী নেহা বোরা।
বিক্ষোভ কলকাতাতেও
জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে রবিবার মিছিল নামে কলকাতার রাস্তাতেও। শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত মিছিলের ডাক দেয় এসএফআই, আইসা-সহ বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলি। দিল্লির আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে, তাঁর ইস্তফার দাবিতে স্লোগান ওঠে মিছিল থেকে। জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে এ দিন কলকাতায় এক সম্মেলনেরও আয়োজন করে ভারত জোড়ো অভিযানের পশ্চিমবঙ্গ শাখা। জ্ঞানেশের অপসারণের পাশাপাশি এসআইআর বাতিল এবং রাজ্যে পুনরায় ভোটের দাবি তুলেছে তারা। সংগঠনের বক্তব্য, “মোদী সরকারকে গণতান্ত্রিক পথে হারাতে হলে ভোটাধিকার ফেরত নিতেই হবে।”
কলকাতায় বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির মিছিল।
আন্দোলনে বিজেপির প্রাক্তন বিধায়কের কন্যাও
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে জ্ঞানেশের অপসারণের দাবিতে শনিবার আন্দোলনে শামিল হন উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন বিজেপি বিধায়কের কন্যাও। শনিবার প্রায় সাত হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ। সেই তালিকায় ছিলেন যশস্বিনী রাজে সিংহও। তিনি উত্তরপ্রদেশের ফতেপুর সদরের বিজেপির প্রাক্তন বিধায়ক বিক্রম সিংহের কন্যা। এর আগে ‘ককরোচদের’ আন্দোলনের জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়েছিল ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন যশস্বিনী।
ছবি: রয়টার্স, পিটিআই এবং নিজস্ব।
