বাংলাদেশের ফ্যাশন অঙ্গনের পরিচিত মুখ সাজরিয়া তাবাসসুম প্রমা এবার পা রাখতে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চে। টোকিওতে তিনি তুলে ধরবেন বাংলাদেশের সংস্কৃতি, আত্মবিশ্বাস ও পরিবেশ সুরক্ষার বার্তা।
আন্তর্জাতিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন মডেল সাজরিয়া তাবাসসুম প্রমা। আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ২০২৬’ নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। আগামী ২৫ নভেম্বর জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত হবে ৬৪তম ‘মিস ইন্টারন্যাশনাল বিউটি প্যাজেন্ট’। সেখানেই বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশের প্রতিযোগীর সঙ্গে অংশ নেবেন প্রমা।

মিস ওয়ার্ল্ড ও মিস ইউনিভার্সের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাগুলোর একটি মিস ইন্টারন্যাশনাল। এই মঞ্চে অংশগ্রহণ প্রমার মডেলিং ক্যারিয়ারে যোগ করতে যাচ্ছে নতুন এক অধ্যায়। তাঁর যাত্রা শুরু হবে ৯ নভেম্বর থেকে। জাপানে অবস্থানকালে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও প্রতিযোগিতামূলক আয়োজনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ পাবেন তিনি। চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে টোকিওর কানাদেভিয়া হলে, যা আগে টোকিও ডোম সিটি হল নামে পরিচিত ছিল।
র্যাম্প থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে
গত কয়েক বছরে দেশের ফ্যাশন অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন প্রমা। গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাশন শোতে র্যাম্পে হাঁটার পাশাপাশি কাজ করেছেন বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডের ফটো ক্যাম্পেইনে। মঞ্চে সাবলীল উপস্থিতি, পেশাদারত্ব এবং আত্মবিশ্বাসী পদচারণা তাঁকে পরিচিতি এনে দিয়েছে মডেলিং অঙ্গনে।

এবার সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে তুলে ধরার পালা। তবে এই যাত্রা কেবল সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত অর্জনের নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশাও।
এর আগে ২০২৪ সালে ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটিতে অনুষ্ঠিত ‘মিস অ্যান্ড মিস্টার সেলিব্রিটি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৪’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন প্রমা। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সেই অভিজ্ঞতা এবার তাঁকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে বলে প্রত্যাশা।
সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিবেশের দায়বদ্ধতা

প্রমার এই যাত্রায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে তাঁর পরিবেশবিষয়ক অ্যাডভোকেসি উদ্যোগ ‘ব্লু গার্ড বিডি’। বাংলাদেশের পানিসম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি এ বিষয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত ও ক্ষমতায়িত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে উদ্যোগটি।
পরিবেশ সংরক্ষণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন দিককে সামনে রেখে ‘ব্লু গার্ড বিডি’র কার্যক্রম জাতিসংঘের সাতটি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এগুলো হলো মানসম্মত শিক্ষা (এসডিজি ৪), লিঙ্গসমতা (এসডিজি ৫), সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন (এসডিজি ৬), টেকসই নগর ও জনপদ (এসডিজি ১১), দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন (এসডিজি ১২), জলজ জীবন সংরক্ষণ (এসডিজি ১৪) এবং অভীষ্ট অর্জনে অংশীদারত্ব (এসডিজি ১৭)।
এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফুটস্টেপস বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে পরিবেশবিষয়ক কার্যক্রম এবং বৃহত্তর পরিসরে সচেতনতা তৈরির প্রচেষ্টা এগিয়ে নিতে চান প্রমা।
সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরার এই প্রচেষ্টা তাঁর অংশগ্রহণে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভার পাশাপাশি নিজের উদ্যোগের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হচ্ছে তাঁর সামনে।
আজরা মাহমুদের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক প্রস্তুতি
বাংলাদেশের ফ্যাশন ও প্যাজেন্ট অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে নতুন প্রতিভা গড়ে তোলার সঙ্গে যুক্ত আজরা মাহমুদ। ২০২৪ সাল থেকে তিনি মিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ন্যাশনাল লাইসেন্সধারী। র্যাম্প ডিরেক্টর, টেলিভিশন উপস্থাপক, অভিনেত্রী, স্টাইলিস্ট ও গ্রুমিং কোচ হিসেবে তাঁর রয়েছে ২৪ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা। বিবিসি বাংলাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।

বর্তমানে তাঁর হাতে রয়েছে পাঁচটি জাতীয় সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার লাইসেন্স—মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ, মিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, মিস কসমো বাংলাদেশ, মিস্টার কসমো বাংলাদেশ এবং ফেস অব বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনেও রয়েছে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা, যার মধ্যে প্যারিস ফ্যাশন উইকে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য।
নতুন প্রতিভা অন্বেষণ ও বিকাশের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আজরা মাহমুদ ট্যালেন্ট ক্যাম্প (এএমটিসি)। এখানে সম্ভাবনাময় মডেল, উপস্থাপক ও সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার প্রতিযোগীদের র্যাম্পে হাঁটা, ব্যক্তিত্বের বিকাশ, গ্রুমিং, যোগাযোগদক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিভাদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করাই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম লক্ষ্য।
প্রমার নির্বাচন প্রসঙ্গে আজরা মাহমুদ বলেন, “প্রমা বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে—আত্মবিশ্বাসী, লক্ষ্যসচেতন এবং বিশ্বমঞ্চের জন্য প্রস্তুত। আমরা তাঁকে নিয়ে গর্বিত। টোকিওতে মিস ইন্টারন্যাশনাল ২০২৬-এ তিনি যে সৌন্দর্য, আত্মবিশ্বাস ও সাবলীলতার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা দেখার অপেক্ষায় আছি।”
টোকিও ঘিরে প্রত্যাশা
আন্তর্জাতিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মডেলিং অঙ্গনের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে প্রমার সামনে। একই সঙ্গে নিজের পরিবেশবিষয়ক উদ্যোগ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দেশের সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করার প্রত্যাশাও রয়েছে তাঁর এই যাত্রাকে ঘিরে।
আগামী ২৫ নভেম্বর টোকিওর চূড়ান্ত মঞ্চে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে নিজের দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব তুলে ধরবেন সাজরিয়া তাবাসসুম প্রমা। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের এই যাত্রায় তাঁর সাফল্য কামনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন অপেক্ষা আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর অভিজ্ঞতা ও অর্জনের নতুন অধ্যায়ের।
ছবি: এএমটিসি
